তিন আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শঙ্কা, সংশোধনের আহ্বান অ্যামনেস্টির

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪০ বিকাল
  • ৩৫৫৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
http://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি; গুম প্রতিরোধ আইন সংশোধন ও এসআরবির জবাবদিহি নিশ্চিতের সুপারিশ

বাংলাদেশে প্রস্তাবিত ও প্রণীত তিনটি আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। ২৬ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন বিধান নিয়ে আপত্তি তুলে ধরা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে অ্যামনেস্টির মহাসচিবের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এ চিঠি পাঠানো হয়।

সাইবার সুরক্ষা আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটির মতে, এর আগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন সংশোধনীতে আগের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান না করে বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ানো হতে পারে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর ৮(২) ধারায় অনলাইনে তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, বিশৃঙ্খলা, অপরাধে উৎসাহ, মানহানি কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি ‘অশ্রদ্ধা’ প্রকাশের অভিযোগে তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধের সুযোগ রাখা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির আশঙ্কা, এসব বিষয়ের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও ব্যাপক হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো তা প্রয়োগ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। তথ্য অপসারণ বা প্রকাশ বন্ধের ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া মানহানি, অপমান, হয়রানি, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে অপরাধের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। অ্যামনেস্টির মতে, এসব বিধান সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচকদের হয়রানি কিংবা তাঁদের কণ্ঠরোধে ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ কারণে সংশোধনীটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

গুম প্রতিরোধ আইন সংশোধনের সুপারিশ

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ প্রণয়নকে স্বাগত জানালেও আইনটিকে আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছে না অ্যামনেস্টি। সংস্থাটি আইনের কয়েকটি বিধান সংশোধনের সুপারিশ করেছে।

গুমের শিকার ব্যক্তির সংজ্ঞা সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অ্যামনেস্টি বলেছে, কাউকে আটক করা এবং পরে তাঁর আটকের তথ্য অস্বীকার বা অবস্থান গোপন করার কাজ একই সরকারি কর্মকর্তাকে করতে হবে—এমন শর্ত থাকা উচিত নয়।

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখার সুযোগসংক্রান্ত বিধানও বাতিলের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে, কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে তাঁর গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলে মনে করে অ্যামনেস্টি।

আইনের ৬ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধানের বিরোধিতা করে দণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ এবং মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণ বিলোপের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ১৮ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার করার সুযোগ নিয়েও আপত্তি রয়েছে তাদের। অ্যামনেস্টির মতে, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের বিচার ন্যায়বিচারের নীতিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।

এ ছাড়া আইনের ২১ ধারায় গুমের বিষয়ে ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ অভিযোগের জন্য ক্ষতিপূরণ অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অ্যামনেস্টির আশঙ্কা, এ বিধান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে অভিযোগ দায়ের থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

এসআরবিতে র‍্যাবের সদস্য ও ক্ষমতা স্থানান্তর নিয়ে প্রশ্ন

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির দাবি, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করে নতুন ইউনিট গঠন করা হলেও আগের বাহিনীর সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পদ এসআরবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির বক্তব্য, র‍্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই আগের বাহিনীর সদস্যদের নতুন ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত করাকে বড় ধরনের ঘাটতি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

অ্যামনেস্টির সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ, তিনটি আইনেই মানবাধিকার সুরক্ষা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad