দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবার স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমের পর দেশের অনশোর বা স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি আকর্ষণের লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যেই অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত দুই দশকে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত গতি ছিল না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও সীমিত ছিল। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন বাড়েনি, আর সেই সুযোগে জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে।বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও আবাসিক খাতে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার কারণে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ছাড়া ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে এই মজুত দিয়ে আনুমানিক আরও ১২ বছর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের শতবর্ষের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পরিত্যক্ত এবং চারটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।সরকারি সূত্র জানায়, বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন দুটি আধুনিক রিগ কেনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অগভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রমে বাপেক্সের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের জ্বালানি খাতকে টেকসই ও স্বনির্ভর করতে সরকার নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সমুদ্র ও স্থলভাগে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ডের মাধ্যমে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুসন্ধান কার্যক্রম সফল হলে দেশের গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, আমদানি ব্যয় কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।