৩০–৩২টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, সংকট ওষুধেও; সংস্কারের তালিকা পাঠানোর কথা জানাল স্বাস্থ্য বিভাগময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশই জরাজীর্ণ। কোথাও ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ভাঙা দরজা-জানালা, অচল শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এর সঙ্গে রয়েছে ওষুধের ঘাটতি এবং চিকিৎসক না পাওয়ার অভিযোগ। ফলে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে।উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশালের ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩২টির ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা ও তালিকা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারী।ছাদ চুইয়ে পানি, নষ্ট শৌচাগারপ্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধাপে ত্রিশালে এসব কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ক্লিনিক থেকে গড়ে সাত হাজার মানুষের মা ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ পাওয়ার কথা।তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ক্লিনিকগুলোর অবকাঠামো নাজুক হয়ে পড়েছে। সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়নের ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় মেঝে। কোথাও দরজা-জানালা ভাঙা, কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আবার কোনো কোনো ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে ফ্যান ব্যবহার করাও কঠিন।বেশির ভাগ ক্লিনিকে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ওষুধের কার্টন রাখার কথাও উঠে এসেছে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে।ওষুধ না পেয়ে ফিরছেন রোগীরাকানিহারী ইউনিয়নের বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন মারজিয়া খাতুন। তিনি জানান, ছেলের জ্বরের ওষুধ নিতে এসে ভবনের ভগ্নদশা দেখে আতঙ্কিত হন। তাঁর অভিযোগ, ছাদ থেকে সিমেন্টের টুকরো খসে পড়ে এবং বৃষ্টির সময় ভেতরে পানি ঢোকে। প্রয়োজনীয় ওষুধও সব সময় পাওয়া যায় না। গ্যাস্ট্রিক ও প্যারাসিটামল ছাড়া অনেক সময় অন্য ওষুধ না থাকায় বাইরে থেকে কিনতে হয়।মঠবাড়ি ইউনিয়নের এক সেবাপ্রার্থী মুস্তাফিজ জানান, ক্লিনিকে বসার উপযুক্ত জায়গা নেই এবং শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসকও নিয়মিত পাওয়া যায় না; সপ্তাহে এক দিন আসেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। নিয়মিত তদারকি ও সময়মতো ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদা লোক না থাকায় এসব কাজও স্বাস্থ্যকর্মীদেরই সামলাতে হয় বলে তাঁরা জানান।নতুন ভবনের জন্য মন্ত্রণালয়ে তালিকাউপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারী বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে পরবর্তী বরাদ্দ আসা পর্যন্ত সংকট তৈরি হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ত্রিশালের ৪৮টি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩২টির ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা ও তালিকা পাঠানো হয়েছে।সংস্কারের জন্য বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে সরাসরি এ ধরনের বরাদ্দ আসে না। স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ প্রস্তাব যাচাই করে কাজ নির্বাচন ও বাস্তবায়ন করে। এ বিষয়ে চার-পাঁচবার প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ, ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মানসম্মত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা ফিরিয়ে আনা হবে।