দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পে জাপানি বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সার উৎপাদনসহ সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে সোমবার টোকিও পৌঁছানোর পর প্রথম দিনের বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। জাপানের সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয় গুরুত্ব পায়।জাইকার সঙ্গে দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনাসোমবার বিকেলে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব জোরদার এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়।এ ছাড়া কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশল খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়।প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় সহজশর্তে ঋণসহায়তা ও কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজেট সহায়তা এবং জাপানের সহায়তায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য সংস্থাটির সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।অটোমোবাইল-সেমিকন্ডাক্টরে বিনিয়োগের আহ্বানসোমবার বিকেলে জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) সভাপতি ও মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান।বৈঠকে অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর, আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।এসব খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন (বিএসইজেড) উন্নয়নে জাপানি সহযোগিতা এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জাপানের সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রী।রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের আলোচনাসফরের প্রথম দিনে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।এ সময় দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।তারো আসো বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী বলেও তিনি উল্লেখ করেন।সহায়তার বদলে বিনিয়োগ অংশীদারত্বটোকিওতে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু সহায়তার ওপর নির্ভর করে এগোতে চায় না। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিনিয়োগভিত্তিক ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।আজ তারেক-তাকাইচি বৈঠকসফরের দ্বিতীয় দিনে আজ মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।স্থানীয় সময় বেলা পৌনে ১২টায় টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে দুই নেতা যৌথ ঘোষণা দেবেন এবং মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন।বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।ইপিএ বাস্তবায়নে গুরুত্বচলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবারের সফরের অন্যতম লক্ষ্য।সফরে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং বিভিন্ন জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।আগামীকাল বুধবার টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরের শেষদিন বৃহস্পতিবার নাগোয়া শহরে টয়োটা মোটর করপোরেশনের কারখানা পরিদর্শনের কথা রয়েছে।দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশা১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। জাপানের সহায়তায় ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।এবারের সফরে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়াই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।