বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পদ্ধতি এবং ছাত্রসংগঠন পরিচালনার কাঠামোতে মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান। তাঁর ভাষায়, ছাত্রসংগঠন ও রাজনৈতিক কাঠামোর দিক থেকে দল দুটি যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অন্যদিকে, জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে তিনি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (ইউকে হোম অফিস) প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক একটি তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরমান। ২০২৬ সালের ৮ জুন ঢাকায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন যুক্তরাজ্যের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) কর্মকর্তারা। প্রতিবেদনটি ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত হয়।ছাত্রসংগঠন পরিচালনায় পার্থক্যের দাবিসাক্ষাৎকারে আরমান বলেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন মূল দলের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ। তাঁর দাবি, দল দুটির গঠনতন্ত্রে ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে মূল দলের প্রভাব রয়েছে। বিপরীতে, ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই এবং জামায়াত ছাত্রশিবিরের সভাপতি নির্ধারণ করে না।তিনি আরও দাবি করেন, ছাত্রশিবিরের সদস্যরা স্থানীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত একই মাত্রার সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন এই সংসদ সদস্য।ক্ষমতার ভারসাম্য ও সংস্কারের দাবিসাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আরমান আট বছর গুম অবস্থায় আটক থাকার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ক্ষমতার জবাবদিহি ও রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানান তিনি।আরমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় ক্ষমতা অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত। বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বেসামরিক প্রশাসনের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সংস্কার প্রয়োজন। এ জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।তাঁর অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারের যে উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলে তা ধীর হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করলে প্রতিশোধের আশঙ্কা বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।রাজনৈতিক সহনশীলতা ও আইন প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগসাক্ষাৎকারে আরমান দাবি করেন, নতুন সরকারের আমলে সরকারের সমালোচনা করার কারণে সাতজন অনলাইন কর্মীকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভুল তথ্য মোকাবিলার নামে নতুন কোনো আইন প্রণয়ন করা হলে তা যেন রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার না হয়। অতীতে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।চাঁদাবাজি ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগনিজের নির্বাচনী এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরে আরমান অভিযোগ করেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়কারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উদ্যোগ নিতে গিয়ে তাঁর সহযোগী এক ব্যক্তি মামলার মুখে পড়েছেন। তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় পুলিশ কার্যকর সহায়তা দিতে পারেনি এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে।বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। রাজনৈতিক পরিচয়, আর্থিক সামর্থ্য ও আইনজীবী নিয়োগের সক্ষমতা বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে বলেও দাবি করেন তিনি।