কোরআন ও হাদিসের আলোকে পবিত্র শবে বরাতইসলামি বর্ষপঞ্জির এক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রাত হলো পবিত্র শবে বরাত। আরবি ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। অর্থাৎ শবে বরাত হলো গুনাহ থেকে মুক্তি ও আল্লাহর রহমত লাভের রাত। এই রাত মুসলমানদের কাছে ক্ষমা, রহমত, বরকত ও ভাগ্য নির্ধারণের এক মহিমান্বিত উপলক্ষ।কোরআনের আলোকে শবে বরাতপবিত্র কোরআনে সরাসরি ‘শবে বরাত’ শব্দটি উল্লেখ না থাকলেও অনেক মুফাসসির (তাফসিরকার) সূরা আদ-দুখানের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতকে শবে বরাতের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন—“নিশ্চয়ই আমি এক বরকতময় রাতে এটি নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।”(সূরা আদ-দুখান: ৩-৪)অনেক আলেমের মতে, এই ‘বরকতময় রাত’ বলতে শবে বরাতকে বোঝানো হয়েছে। এই রাতে মানুষের রিজিক, জীবন-মৃত্যু ও আগামী বছরের গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা লিপিবদ্ধ করা হয় বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।হাদিসের আলোকে শবে বরাতের ফজিলতহাদিস শরিফে শবে বরাতের গুরুত্ব ও ফজিলত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—“আমি এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হারিয়ে ফেললাম। পরে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে তাঁকে সিজদারত অবস্থায় পেলাম। তখন তিনি বললেন— নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাতে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বনি কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করেন।”(তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শবে বরাত হলো ব্যাপক ক্ষমা লাভের রাত। তবে কিছু গুনাহগার ব্যক্তি—যেমন শিরককারী, বিদ্বেষ পোষণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী—এই রাতে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয় বলে অন্য হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।শবে বরাতের আমলরাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এই রাতে বিশেষভাবে নফল নামাজ, দোয়া, জিকির ও ইস্তেগফারে মশগুল থাকতেন। যদিও ফরজ ইবাদতের বাইরে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ নির্ধারিত নয়, তবে বেশি বেশি ইবাদত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।শবে বরাতে করণীয় আমলগুলো হলো—নফল নামাজ আদায়কোরআন তিলাওয়াততওবা ও ইস্তেগফারদোয়া ও মোনাজাতপরদিন (১৫ শাবান) নফল রোজা রাখা (হাদিস দ্বারা প্রমাণিত)কুসংস্কার ও বিদআত থেকে বেঁচে থাকাশবে বরাত পালন করতে গিয়ে কিছু কুসংস্কার ও বিদআত সমাজে প্রচলিত রয়েছে, যেমন— আতশবাজি, হালুয়া-রুটি বিতরণকে বাধ্যতামূলক মনে করা ইত্যাদি। এগুলো ইসলামসম্মত নয়। ইবাদত হতে হবে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে।উপসংহারপবিত্র শবে বরাত মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। এই রাত আমাদেরকে তওবা, আত্মসমালোচনা ও সৎপথে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এই রাত যথাযথভাবে পালন করলে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ অর্জন সম্ভব।আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে শবে বরাতের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন—আমিন।