যমুনায় নদীভাঙনে কাঁদে মানুষ, বালু বাণিজ্যে ফুলে-ফেঁপে উঠছে সাত্তারের সাম্রাজ্যযমুনা নদীজুড়ে বৈধ পাঁচটি বালুমহলের আড়ালে গড়ে উঠেছে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিশাল এক সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ‘বালু সাত্তার’ নামে পরিচিত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হাজী সাত্তার। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় বছরের পর বছর ধরে যমুনার বুকে চলছে অবাধ বালু লুট।এর ফলে ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়েছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমি, বসতভিটা, সড়ক, বাঁধ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।বৈধ বালুমহলের আড়ালে অবৈধ উত্তোলনসরকারিভাবে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পাঁচটি পয়েন্ট বালুমহল হিসেবে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো— সদর উপজেলার কৈগাড়ি দরতা, জিয়ারপাড়া ও চন্দলবয়রা, কাজিপুর বালুমহল এবং শাহজাদপুর উপজেলার শিমলা বালুমহল।তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বৈধ বালুমহলের বাইরেও রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে যমুনার বিভিন্ন অংশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে কয়েকদিন পরপর স্থান পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ করে মেছড়া, খিদ্রমাটিয়া, মেঘুল্লা, আরকান্দি-ঘাটবাড়ি, নারিনা, জোতপাড়া ও উমরপুর এলাকায় ব্যাপকহারে চলছে অবৈধ ড্রেজিং।ভয়াবহ ভাঙনে আতঙ্কিত নদীপাড়ের মানুষস্থানীয়দের ভাষ্য, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে যমুনা নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র স্রোত সরাসরি তীরে আঘাত হানছে। ফলে দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে নদীভাঙন।কাজিপুর উপজেলার পলাশপুর ঘাট, ইকো পার্ক, মেঘাই ঘাট ও ঢেকুরিয়া এলাকায় ইতোমধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। শাহজাদপুর উপজেলার আরকান্দি-ঘাটবাড়ি, বিনোটিয়া, মাজ্জান ও নারিনা এলাকায় হুমকির মুখে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।বেলকুচিতে যমুনার তলদেশ থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে সদর ইউনিয়ন ও এনায়েতপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাল্কহেড চলাচলের ফলে সৃষ্ট তীব্র ঢেউ নদীতীর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকাও।অন্যদিকে চৌহালী উপজেলার জোতপাড়া, উমরপুর ও ঘোরজান এলাকায় শত শত বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।প্রশ্নের মুখে ইজারা প্রক্রিয়াবালু উত্তোলন ও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী নদী থেকে বালু উত্তোলনের আগে হাইড্রোগ্রাফিক বা বাথিমেট্রিক জরিপ বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি সেতু, বাঁধ, রেললাইন ও জনবসতি সংলগ্ন এক কিলোমিটারের মধ্যে ড্রেজিং নিষিদ্ধ।কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, যমুনা নদীর বালুমহল ঘোষণার আগে প্রয়োজনীয় জরিপের নির্ভরযোগ্য কোনো নথি জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। আরটিআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের রেকর্ড না থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করেই বালুমহল ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ ইজারা এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।‘বালু সাত্তার’ নামেই নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট!স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, পুরো বালু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম হাজী সাত্তার ওরফে ‘বালু সাত্তার’। অভিযোগ রয়েছে, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার, বাল্কহেড ও পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে।এছাড়া দেশের বিভিন্ন ডেভেলপার ও রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।সিরাজগঞ্জ শহরের মতি সাহেবের ঘাট এলাকার একসময়ের শ্রমিকনেতা সাত্তার এখন বিপুল সম্পদের মালিক। তার নামে রয়েছে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, ডকইয়ার্ড ও রিসোর্ট। সম্প্রতি তিনি নিজেকে পৌর মেয়র প্রার্থী হিসেবেও প্রচার চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাত্তারের রাজনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে। বিএনপি সরকারের সময় বিএনপি ঘনিষ্ঠ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে আবার বিএনপির পরিচয়ে সক্রিয় হয়েছেন তিনি।হত্যা মামলার অভিযোগও ছিল২০১২ সালে যমুনার বালুমহল দখলকে কেন্দ্র করে শ্রমিক নেতা নাসির উদ্দিন হত্যা মামলায় সাত্তারের নাম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে। ওই ঘটনায় আহত শাকিল আহমেদ টিক্কাও পরে মারা যান। যদিও পরবর্তীতে সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানা গেছে।প্রশাসনের বক্তব্যসিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন,“ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও-টেক্সটাইল ও বালিভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন,“তফসিলি বালুমহলের বাইরে কোথাও বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”তবে বালু সাত্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্নস্থানীয়দের প্রশ্ন— প্রশাসনের চোখের সামনে বছরের পর বছর কীভাবে চলছে এই অবৈধ বালু বাণিজ্য? কেন বন্ধ হচ্ছে না নদীভাঙন? আর কারা রয়েছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নেপথ্যে?যমুনা তীরবর্তী মানুষের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী বর্ষায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে পুরো নদীতীরবর্তী অঞ্চল।তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্কাই