অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে ঈদযাত্রায় প্রাণহানি: প্রতিদিন গড়ে তিন মৃত্যু, বাড়ছে মৃত্যুফাঁদে পরিণত রেলপথ”ঈদযাত্রায় রেলপথে বাড়ছে ঝুঁকিঈদ সামনে রেখে দেশের রেলপথজুড়ে অরক্ষিত ও অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো আবারও ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রেনের হুইসেল বাজলেও অনেক জায়গায় নেই গেট, নেই গেটম্যান—ফলে নিয়ম ভেঙে রেললাইন পারাপারই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে।Bangladesh Railway-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে তিন হাজারের বেশি বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি স্থানে নেই গেটম্যান, ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর।এক দশকে প্রায় ১০ হাজার প্রাণহানিরেলওয়ে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৯ হাজার ২৩৭ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনজন মানুষ রেল দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছেন। এর বড় অংশই ঘটছে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক দুর্ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না।সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রুট: ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডোরদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে Dhaka–Chattogram railway corridor। বিশেষ করে কুমিল্লা, লাকসাম, লালমাই ও নাঙ্গলকোট এলাকায় অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা বেশি এবং দুর্ঘটনার হারও সর্বোচ্চ।চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নতুন পর্যটন রুটেও ৭২টির মধ্যে ৫৬টি ক্রসিং অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে বহু প্রাণহানি ঘটেছে।পরিসংখ্যান ও গবেষণায় উদ্বেগবিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী—গত ১০ বছরে লেভেল ক্রসিংয়ে অন্তত শতাধিক প্রাণহানি২০১৯–২০২৪ সময়ে রেল দুর্ঘটনায় ১,২৬৯ জনের মৃত্যু২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৪৭ জন নিহতRoad Safety Foundation-এর তথ্যে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।গেটম্যান সংকট ও অব্যবস্থাপনাপূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে শত শত বৈধ ক্রসিংয়ে নেই গেটম্যান। অনেক জায়গায় বাঁশের ব্যারিকেড বা খোলা রেলপথই একমাত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।রেলকর্মীদের অভিযোগ, স্বল্প বেতন ও জনবল সংকটের কারণে দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।ঈদে কেন বাড়ে দুর্ঘটনাঈদ মৌসুমে—অতিরিক্ত যাত্রীর চাপগভীর রাতে ট্রেন চলাচল বৃদ্ধিযানবাহনের তাড়াহুড়োগেটম্যানদের ক্লান্তি ও অনিয়মএসব কারণে লেভেল ক্রসিংগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।বিশেষজ্ঞদের মতামতChittagong University of Engineering and Technology-এর পুরকৌশল বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোমেটিক গেট, আন্ডারপাস নির্মাণ এবং অবৈধ ক্রসিং দ্রুত বন্ধ না করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বিশেষ টাস্কফোর্স ও সাইরেন-সিগন্যাল ব্যবস্থা জরুরি, আর দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হিসেবে আন্ডারপাস নির্মাণই একমাত্র কার্যকর পথ।রেল কর্তৃপক্ষের অবস্থানBangladesh Railway কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদে যাত্রীচাপ বাড়া স্বাভাবিক হলেও দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি ও নির্দেশনা জোরদার করা হয়েছে।অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং এখন দেশের রেলপথের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে ঈদযাত্রার সময় এই ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়ে রূপ নেয় প্রাণঘাতী সংকটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই “মৃত্যুফাঁদ” বন্ধ করা কঠিন হবে।