৭৫ বছরের চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক: কৌশলগত বন্ধুত্বের ভিত ভারতবিরোধী সমীকরণবিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ভূখণ্ড নিয়ে সংঘাত, যুদ্ধ ও বিরোধ নতুন কিছু নয়। তবে ১৯৬৩ সালের মার্চে এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। সীমান্ত চুক্তির আওতায় কারাকোরাম পর্বতমালার শাকসগাম উপত্যকার প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা চীনের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয় ইসলামাবাদ। ভারত ওই অঞ্চলকে বিতর্কিত কাশ্মীরের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এ সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল সুস্পষ্ট কৌশলগত হিসাব। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পর ইসলামাবাদ মনে করেছিল, ভারতের দাবির মুখে বিতর্কিত ওই অঞ্চল নিজেদের হাতে রাখার চেয়ে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা তাদের জন্য বেশি নিরাপদ ও কার্যকর হবে।গত ২১ মে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে চীন ও পাকিস্তান। দীর্ঘ এই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের বিরুদ্ধে দুই দেশের অভিন্ন কৌশলগত অবস্থান। এ উপলক্ষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সিনেটে সফররত চীনা প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘লৌহ-কঠিন ভ্রাতৃত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই দিনে পাকিস্তানের সিনেটে সর্বসম্মতিক্রমে ‘চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব পুনর্ব্যক্তকরণ’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়। উদযাপনের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং যাচ্ছেন।বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি আদর্শিক মিল নয়; বরং পারস্পরিক কৌশলগত প্রয়োজন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মারিয়া অ্যাডেল ক্যারাই আলজাজিরাকে বলেন, “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ৭৫ বছরের ইতিহাস মূলত পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় একে অপরের কৌশলগত প্রয়োজন মেটানোর গল্প।”১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে চীনের কমিউনিস্ট সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটিও ছিল ভারতকে মোকাবিলার কূটনৈতিক কৌশলের অংশ। পরে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সিয়াটো ও সেন্টো জোটে যোগ দিলেও বেইজিংয়ের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রাখে ইসলামাবাদ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন বেইজিং সফর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও চীনের সহায়তা পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দেন। এর দুই বছর পর ১৯৭৬ সালে দুই দেশ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের দাবি, ১৯৮০-এর দশকে চীন পাকিস্তানকে অস্ত্র নকশা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহে সহায়তা করে। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের চাগাই পারমাণবিক পরীক্ষার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কঠোর অবস্থান ঠেকাতেও ভূমিকা রাখে বেইজিং।বর্তমানে পাকিস্তানের উন্নত সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই আসে চীন থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের তৈরি চেংদু জে-১০ যুদ্ধবিমান ও পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইসলামাবাদ সফরে ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্প ঘোষণা করেন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরকে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। যদিও প্রকল্পটি পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে, তবে অর্থনৈতিক সংকট ও ঋণচাপ কমাতে তেমন কার্যকর হয়নি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সিপিইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের পর বিভিন্ন হামলায় অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে গোয়াদরসহ বেলুচিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বেলুচ লিবারেশন আর্মির সমন্বিত হামলা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশ চীন। পাকিস্তানের ওপর চীনের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২২ শতাংশ। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি চীনের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারে ২৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রথম ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যু করেছে পাকিস্তান।বেইজিংভিত্তিক গ্র্যান্ডভিউ ইনস্টিটিউটের পরিচালক জৌ রং মনে করেন, চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, “অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভারতের বিরুদ্ধে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তানকে কখনোই ভেঙে পড়তে দেবে না চীন।।