জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র-নির্দেশিত দমননীতির অংশ হিসেবে পুলিশের সদস্যরা আবু সাঈদকে ইচ্ছাকৃত ও বেআইনিভাবে হত্যা করেছে এবং ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা রায়ে স্বাক্ষর করার পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ের বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপক্ষ উচ্চতর আদালতে আপিল করবে বলেও জানান তিনি।পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার তথ্য-অনুসন্ধানী মিশনের ফরেনসিক ও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ভিডিও ফুটেজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণের ধরন বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, আবু সাঈদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল।ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক ও পরিকল্পিত দমন-পীড়নের অংশ। ফলে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৩(২)(ক) অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।রায়ে বলা হয়েছে, একাধিক আঘাতজনিত শক ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়। তার শরীরে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভেদকারী আঘাতেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল ঘটনাটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।এর আগে গত ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার রায় ঘোষণা করে। রায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।এ ছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় মাধবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়াসহ পাঁচজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।এ ছাড়া আটজনকে পাঁচ বছর এবং ১১ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের ক্ষেত্রে তার হাজতবাসের মেয়াদকেই সাজা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময় রংপুরে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তীতে ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন হয়।