আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসকে ‘স্বৈরতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদের ধারাবাহিকতা’ হিসেবে অভিহিত করে আমার দেশ সম্পাদক ও ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদের আইকন’ হিসেবে দেখেন।মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) আয়োজিত ‘আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।মাহমুদুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল থেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই; বরং দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেলে শেখ মুজিবও একই ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতেন।তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে গণমাধ্যমকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে ‘চাটুকার তৈরির কারখানায়’ পরিণত করা হয়েছে। অতীত ও বর্তমান—উভয় সময়েই ক্ষমতাসীনদের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য প্রদর্শনের সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো প্রচেষ্টার সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনাকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উভয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকেই বিবেচনায় নিতে হবে।১৬ জুনকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দিনটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে ধারা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল।সাংবাদিকদের উদ্দেশে মাহমুদুর রহমান বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার অধিকার রক্ষায় আরও দৃঢ় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।তিনি বলেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করার আহ্বান জানান তিনি।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএজের সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম. আবদুল্লাহ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম। তিনি বলেন, গণমাধ্যম যখন জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক সংকট গভীরতর হয়। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।ড. মাসুম বলেন, একটি স্বাধীন, নির্ভীক ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে না। তিনি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং সত্য প্রকাশের সংস্কৃতি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।