নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্বাচন ভবনে স্থাপন করা হয়েছে শতাধিক আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা। তবে স্থাপনের পরই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ত্রুটি। নির্বাচন ভবনের চারপাশে সিটি করপোরেশনের লাগানো বড় বড় গাছ ক্যামেরার দৃষ্টিসীমা ঢেকে দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। ফলে কোটি টাকার এই নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন ভবনের বাইরে সংঘটিত হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা নাশকতার মতো ঘটনা ঘটলেও গাছের আড়ালে থাকা অংশের স্পষ্ট ভিডিও ধারণ সম্ভব হচ্ছে না। এতে অপরাধীদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার বড় একটি অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে রয়েছে।পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন ভবনের আশপাশের গাছ অপসারণের বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন। তবে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিকল্পনার ত্রুটির দায় গাছের ওপর চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়; বরং এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতারই প্রতিফলন।ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নির্বাচন ভবনের নিরাপত্তা কমিশনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ক্যামেরার দৃষ্টিসীমায় কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে প্রথমে নিজস্ব উদ্যোগে তা দূর করার চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হবে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত নির্বাচন ভবনের সামনে একাধিক মিছিল, বিক্ষোভ, ককটেল বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে নতুন নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।ইসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শাখার কর্মকর্তারা জানান, আইডিয়া প্রকল্পের আওতায় দুই ধাপে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার নিরাপত্তা প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রথম ধাপে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে ১২০টি আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। তিন বছরের ওয়ারেন্টিসহ এসব ক্যামেরা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।নির্বাচন ভবনের চারপাশ, প্রধান প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ করিডর, বিভিন্ন তলা, লিফট ও সিঁড়ি সংলগ্ন এলাকা ছাড়াও ভবনের চার কোণ, লেকপাড় এবং নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনের সামনের অংশে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে স্থাপন করা হয়েছে একাধিক ওয়াচ টাওয়ারও।তবে কর্মকর্তাদের দাবি, ভবনের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক হলেও বাইরের ক্যামেরাগুলোর কার্যকারিতা গাছের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভবনের বাইরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।এদিকে নির্বাচন ভবনে আগে থেকেই থাকা ১৫২টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ১১২টি। বাকি ৪০টি ক্যামেরা অচল অবস্থায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নতুন ক্যামেরাগুলোর অবস্থাও ভবিষ্যতে একই রকম হতে পারে।ইসির সিস্টেম ম্যানেজার প্রকৌশলী রফিকুল হক বলেন, আইডিয়া প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।অন্যদিকে পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিষদের সদস্য শরীফ জামিল বলেন, গাছ কেটে ক্যামেরার দৃষ্টিসীমা বাড়ানোর যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, পরিকল্পনার সময় পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় না নেওয়ার দায় এখন গাছের ওপর চাপানো হচ্ছে। প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া গাছ অপসারণের উদ্যোগ পরিবেশবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; কার্যকর পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত না হলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পও কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।