ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে টানা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকা ছিলেন ২৩ বছর বয়সী আন্দ্রেয়া ক্যানোনিকো। চারদিকে মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও তিনি হারাননি বেঁচে ফেরার আশা। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারীদের নিরলস প্রচেষ্টায় জীবিত উদ্ধার হন এই তরুণী।গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় রিখটার স্কেলে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় লা গুইরা শহরের লস কোরালেস এলাকা। দেশটির কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যমতে, এ দুর্যোগে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু মানুষ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।উদ্ধারের পর বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দ্রেয়া বলেন, “আমি কখনোই আশা হারাইনি।” তবে তার ২০ বছর বয়সী ভাই এবং ৯১ বছর বয়সী ফুফু এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপের প্রায় ছয় মিটার নিচে আটকা পড়েও তিনি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। নিজের মনকে বারবার বোঝান, আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের আলো এবং সময় দেখার সুযোগ তাকে মানসিকভাবে কিছুটা শক্তি জুগিয়েছিল।আন্দ্রেয়ার ভাষ্য, ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে থাকা আরেক ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। পরে ওই ব্যক্তি উদ্ধার হওয়ার পর উদ্ধারকর্মীদের জানান, নিচে আরও একজন জীবিত রয়েছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই উদ্ধারকারীরা অভিযান চালিয়ে আন্দ্রেয়াকে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হন।তিনি বলেন, ওপরে একটি ছোট ফাঁকা জায়গা ছিল, যেটি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে উদ্ধারকর্মীদের তৈরি করা পথ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন। পরে উদ্ধারকারীরা তাকে টেনে বাইরে নিয়ে আসেন।এদিকে ধ্বংসস্তূপে জীবিত মানুষের সন্ধানে দিন-রাত কাজ করছেন ২৬ বছর বয়সী সাবেক খনিশ্রমিক মোইসেস ফারামায়া। স্থানীয়দের কাছে ‘দ্য মোল’ নামে পরিচিত এই উদ্ধারকর্মী এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে জীবিত এবং ২২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন।মোইসেস জানান, তিনি মূলত একটি গাঁইতি ও একটি কোদাল ব্যবহার করেই ধ্বংসস্তূপ সরান। বলিভার রাজ্যের এল কায়াও অঞ্চলের খনিতে ছয় বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে এ কাজে দক্ষ করে তুলেছে। উদ্ধার অভিযানে দমকল বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরাও তার সহযোগিতা নিচ্ছেন।তিনি বলেন, “এই কাজ মোটেও সহজ নয়। ধুলাবালি, ধ্বংসস্তূপ এবং পচে যাওয়া মরদেহের গন্ধের মধ্যেও আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তবুও যতক্ষণ সম্ভব, জীবিত মানুষ উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”অন্যদিকে আন্দ্রেয়ার ভবনের সবাই মারা গেছেন বলে প্রথমে ধারণা করা হলেও পরে কিছু জীবিত থাকার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ৪৪ বছর বয়সী রেস্তোরাঁকর্মী আলেকজান্ডার গার্সিয়া জানান, দমকল বাহিনীর ‘কোড-১৪’ ঘোষণার অর্থ ছিল সেখানে আর কোনো জীবিত ব্যক্তি নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল এবং স্পেন থেকে আনা প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর জীবিত মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিলে তার দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধারের আশা আবার জেগে ওঠে।গার্সিয়া বলেন, “সবাই তাদের আওয়াজ শুনেছিল।” তবে তার মা ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হলেও পরে হাসপাতালে মারা যান।রাতভর টর্চের আলোয় উদ্ধার অভিযান চললেও মঙ্গলবার সকালের ভারি বৃষ্টির কারণে কিছু সময়ের জন্য অভিযান বন্ধ রাখতে হয়। এতে উদ্ধারকর্মীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো প্রথম ৭২ ঘণ্টা। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় নতুন করে জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তবুও ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।