সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে দায়িত্বে থাকা স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই আইরিন খান নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নিউইয়র্কে যোগ দিতে পারেন।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইরিন খান ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার–এর কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২০ সালের ১ আগস্ট এ দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি ১৯৯৩ সালে পদটি চালুর পর প্রথম নারী হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন।তিনি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে শিক্ষকতা করছেন। মানবাধিকার ও দারিদ্র্যবিষয়ক আলোচিত গ্রন্থ The Unheard Truth: Poverty and Human Rights-এর সহলেখকও তিনি। বইটি বিশ্বের সাতটি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।আইরিন খান ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল–এর মহাসচিব ছিলেন। সংস্থাটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী মহাসচিব। তার নেতৃত্বে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার কর্মসূচি জোরদার হয়। একই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে অ্যামনেস্টির প্রথম বৈশ্বিক প্রচারণাও শুরু হয়।পরবর্তীতে ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশন (আইডিএলও)–এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা এই আন্তসরকারি সংস্থার নেতৃত্বে থেকে তিনি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-১৬ বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।পেশাজীবনের শুরুতে তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)–এ যোগ দেন এবং টানা ২১ বছর বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ভারতে ইউএনএইচসিআরের মিশনপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষাবিষয়ক বিভাগের উপপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।এ ছাড়া তিনি কলাম্বিয়া গ্লোবাল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন কর্মসূচির অ্যাওয়ার্ড জুরিবোর্ডের সদস্য। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল, ইউএনএইডসের মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল এবং ইউএন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল–এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই), ব্র্যাক এবং বেয়ারফুট ল–উগান্ডার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য।মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৬ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ সিডনি পিস প্রাইজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন।বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আইরিন খান যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড ল স্কুলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এছাড়া ২০১১ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল স্কুলে ভিজিটিং প্রফেসর এবং ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।সরকারের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, কূটনীতি ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্ব জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে কূটনৈতিক মহলে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।