স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত শেষে রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ গণহত্যাকারী কোনো শক্তিকে আর রাজনীতি করার সুযোগ দেবে না।”বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়; এটি দেশের কোটি মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফসল। তাই এ অর্জনকে দলীয়করণের পরিবর্তে এর চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। শহীদ পরিবার ও আহতদের ত্যাগ দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আন্দোলনের সময় মাঠপর্যায়ের বহু নেতা কারাগারে, গুম কিংবা আত্মগোপনে থাকলেও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে।নিজের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি ‘আয়নাঘরে’ ৬১ দিন ছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। তিনি বলেন, স্বৈরশাসন শুধু ব্যক্তিকেই নয়, তাদের পরিবারকেও চরম ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, গুম, খুন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এ গণঅভ্যুত্থান। বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অসংখ্য নেতা-কর্মী এ সময় নির্যাতনের শিকার হন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ পথ রুদ্ধ করে দিলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়নের কারণেই আন্দোলন রক্তাক্ত হয়েছে এবং নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে।সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানানো হয়েছে। সাংবাদিক, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।তিনি জানান, জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খসড়া আইন জনমতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা সংসদে উপস্থাপন করা হবে।জুলাই আন্দোলনে আহতদের পুনর্বাসনের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, যারা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন কিংবা স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য পৃথক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। একই সঙ্গে এখনো তালিকাভুক্ত না হওয়া প্রকৃত আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি তিনি ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন এনে ব্যক্তি ছাড়াও কোনো সংগঠনের বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে তিনি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন; বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বলে মত দেন।বক্তব্যের শেষাংশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সংসদীয় বিরোধিতা থাকলেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য অটুট রাখতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে স্বৈরাচারী আচরণ করতে না পারে, সে জন্য জুলাই জাদুঘর নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন; সেই লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করাই এখন সবার প্রধান দায়িত্ব।