২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি থাকলেও সমর্থকদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চান না বলে জানিয়েছেন তিনি। তার এই ঘোষণাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।বুধবার নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তায় ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, তাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে কিংবা সাজানো মামলার রায় কার্যকর করার চেষ্টা হতে পারে। তবে জনগণের প্রতি তার দায়িত্ব পালনে এসব ভয় বাধা হতে পারে না।২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়।মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ড২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। ট্রাইব্যুনালটি তার সরকারের আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও নয়াদিল্লি জানিয়েছে, বিষয়টি পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এদিকে তার বক্তব্য সম্প্রচারের সময় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও কুশপুত্তলিকা দাহের ঘটনা ঘটে।সরকারের প্রতিক্রিয়াপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নয়াদিল্লিতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। সরকারের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।অন্যদিকে মাগুরায় শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ জনতা সাবেক ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের পৈতৃক বাড়িতে হামলা চালায়। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সাকিব বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, আত্মসাৎ, প্রতারণা ও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে।জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনশেখ হাসিনার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার সাবেক সরকারি বাসভবনে একটি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।আওয়ামী লীগের প্রত্যাশাশেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দলটির কয়েকজন নেতা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নেতা বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এবং দল আবার প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করবে।আত্মগোপনে থাকা আরেক কর্মী শাজিদুল ইসলাম সবুজ জানান, দল পুনর্গঠনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং নেতাকর্মীরা তার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।আন্দোলনের নেতাদের অবস্থান২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতারা বলছেন, জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ নেই।জাতীয় নাগরিক দলের (এনসিপি) সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে ফিরতে পারেন, তবে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।গণঅভ্যুত্থানে আহত আতিকুল গাজী, যিনি ওই আন্দোলনে একটি হাত হারিয়েছেন, বলেন, শেখ হাসিনা আগেও দেশ না ছাড়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু পরে দেশত্যাগ করেন। তাই তার বর্তমান ঘোষণাকে তিনি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারকে অবশ্যই বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।রাজনৈতিক কৌশল নাকি বাস্তব পরিকল্পনা?সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে। দেশে ফিরলে তিনি আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেন এবং সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।তবে তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ এখনো নিজেদের রাজনৈতিক পতনের কারণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। দলটি নিজেদের দায় স্বীকার না করলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে।ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক মুবাশার হাসান বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা মূলত আওয়ামী লীগের হতাশ নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়ানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, এই কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন উত্তেজনাশেখ হাসিনার বক্তব্যের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো স্থান নেই। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি অবমাননা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্য সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত শাহরিয়ার খান আনাসের পরিবার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।অন্যদিকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রিসুল ইসলাম রিফাত বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা বাস্তবসম্মত নয়। তার ভাষায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক শক্তি এবং জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ শেখ হাসিনার রাজনীতির পুনরাবৃত্তি চায় না।