গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্বে গঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস প্রথম নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে আবাসন বা মানবিক অবকাঠামোর পরিবর্তে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ঘাঁটিটি ১৫০ সদস্যের মরক্কোর সেনাদের অবস্থানের জন্য নির্মাণ করা হবে। যদিও চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে নির্মাণকাজের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্কেল ইন্টারন্যাশনাল-কে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন সরকারের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।চলতি বছরের জানুয়ারিতে গাজা পুনর্গঠনের তদারকির জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি নিজেই এর চেয়ারম্যান। বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন তার জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিভ উইটকফ।বোর্ডের এক কর্মকর্তা ই-মেইলে জানিয়েছেন, বোর্ড এবং গাজার প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের সংগঠন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) কয়েকটি নির্মাণচুক্তি চূড়ান্ত করার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এখনো কোনো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি।তার ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য একটি চুক্তি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ)-এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত। এই বাহিনী গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।তবে গাজা পুনর্গঠনের এই উদ্যোগের সময় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক দিন আগে ট্রাম্প দাবি করেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণে সম্মত হয়েছে। কিন্তু কীভাবে সেই নিরস্ত্রীকরণ কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সময়ে ইসরাইল এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে গাজায় বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে।বড় পরিকল্পনা থেকে ছোট সামরিক প্রকল্পগত জুলাইয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, পুরো গাজাকে আধুনিকভাবে পুনর্গঠনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বোর্ড অব পিস এখন দক্ষিণ গাজার একটি সীমিত পরিসরের পাইলট প্রকল্পে মনোযোগ দিচ্ছে।নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সামরিক ঘাঁটির আয়তন হবে ১০০ মিটার × ১২০ মিটার। সেখানে মরক্কোর সেনাদের একটি ছোট ইউনিট অবস্থান করবে এবং তারা ইসরাইলের একটি ঘাঁটি থেকে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করবে।ঘাঁটিটি গাজার এমন একটি এলাকায় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশ বর্তমানে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া ওই এলাকার বাইরে একটি বাফার জোনও গড়ে তুলেছে ইসরাইল।সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটিটি ইসরাইল সীমান্ত থেকে প্রায় এক মাইল দূরে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও সেখানে রাখা হবে।ভবিষ্যতে বড় সামরিক ঘাঁটির ভিত্তিজাতিসংঘের অনুমোদিত পরিকল্পনায় গাজার জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে বাহিনীটির আইনি কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মরক্কো সীমিতসংখ্যক সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের মোতায়েনের সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি।এর আগে প্রকাশিত একটি খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, ১৫০ সদস্যের এই ঘাঁটিই ভবিষ্যতে প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের একটি বৃহৎ সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের প্রথম ধাপ হতে পারে।প্রাথমিক পরিকল্পনায় সেনাদের জন্য তাঁবু, খাট, রাসায়নিক শৌচাগার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, যানবাহন রাখার স্থান এবং প্রতিরক্ষামূলক মাটির বাঁধ নির্মাণের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এসব অবকাঠামো স্বল্পমেয়াদি অবস্থানের উপযোগী করে তৈরি করা হবে।যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় পুনর্গঠনের বাস্তবতা২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং এর পুনর্গঠনের দায়িত্ব পালন করবে। তবে পরে বোর্ড অব পিস গঠনের আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে এ ধরনের কোনো বিধান রাখা হয়নি।বোর্ডের প্রথম বৈঠকে জ্যারেড কুশনার 'নিউ গাজা' নামে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এতে সমুদ্রতীরবর্তী আধুনিক নগরী, বহুতল ভবন এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ধারণা তুলে ধরা হয়।তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চলমান সংঘাতে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধবিরতির প্রায় ১০ মাস পরও প্রায় ২০ লাখ মানুষ অস্থায়ী ও অস্বাস্থ্যকর আশ্রয়শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।