দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি থাকলেও আয়-সক্ষমতার অভাব, ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ ইতোমধ্যে জরুরি পর্যায়ের মারাত্মক খাদ্য সংকটে রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মূল্যায়ন ব্যবস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং গেইনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এ বিশ্লেষণ সম্প্রতি ঢাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিট (এফপিএমইউ) আয়োজিত এক কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওরাঞ্চল, উপকূলীয় জেলা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি।খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণকে নীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে আরও কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, প্রতিবেদনের তথ্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি খাদ্যশস্য মজুতখাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল, গম ও ধান মিলিয়ে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে চাল ১৯ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৬ টন, গম ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৯ টন এবং ধান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬০৫ টন।খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন জানান, নিরাপদ মজুতের সর্বনিম্ন সীমা ১৬ লাখ টন হলেও বর্তমানে মজুত তার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন বেশি।তিনি জানান, গত অর্থবছরে বোরো সংগ্রহ অভিযানে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৩১ টন ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম ২৩ দিনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ৩ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। এ সময় খাদ্য সহায়তা হিসেবে কোনো আমদানির প্রয়োজন হয়নি।এ ছাড়া দেশের খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা ২৪ লাখ টন থেকে ২৭ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে তা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।কেন বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাবিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকারি খাদ্য মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও সংকটের মূল কারণ খাদ্যের ঘাটতি নয়; বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল, হাওরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী মানুষেরা মৌসুমি বন্যা, লবণাক্ততা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সীমিত আয়ের কারণে নিয়মিত খাদ্য সংগ্রহে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।বৈশ্বিক সংকটেরও প্রতিফলনজাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি) ২০২৬ অনুযায়ী, গত এক দশকে বিশ্বে তীব্র ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন।বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন—এই ১০টি দেশেই বিশ্বের তীব্র খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বসবাস করে।আইপিসি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও লাখো মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহে অক্ষম হয়ে পড়তে পারেন।বাংলাদেশে এফএওর প্রতিনিধি ড. জিয়াওকুন শি বলেন, বারবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগে আক্রান্ত এলাকায় কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সহনশীলতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।ডব্লিউএফপির বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা বলেন, আইপিসি বিশ্লেষণ সংকট গভীর হওয়ার আগেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। ফলে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে সংঘাতকে দায়ী করেছেন। ডব্লিউএফপির নির্বাহী পরিচালক সিন্ডি ম্যাককেইন বলেন, সংঘাত ও মানবিক সহায়তার তহবিল সংকটের কারণে একই দেশগুলো বারবার খাদ্য সংকটে পড়ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, দুর্গম এলাকায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।