রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টানা ১৪ অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হলো রাষ্ট্রের প্রধান রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানটি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারের আর্থিক ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে। ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে সরকারের ঋণের পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ ব্যয়ে।বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার পেছনে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো—লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ত্রুটি, অর্থনীতির কাঠামোগত সংকট, ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স সংস্কৃতির অভাব এবং এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি।আড়াই দশকে মাত্র পাঁচবার মূল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনএনবিআরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আড়াই দশকে মাত্র পাঁচবার মূল লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে সংস্থাটি।২০০০-০১ অর্থবছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা আদায় হয়। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১০৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্জিত হয়।২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৪৩ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৪৭ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।২০০৯-১০ অর্থবছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ৬২ হাজার ৪২ কোটি টাকা এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ৭২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার বিপরীতে ৭৯ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে এনবিআর। ওই দুই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায়ের হার ছিল যথাক্রমে ১০১ দশমিক ৭১ শতাংশ ও ১০৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ।এর পরের বছর, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৯৫ হাজার ৫৯ কোটি টাকা আদায় হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ।এরপর টানা ১৪ অর্থবছরে আর মূল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এনবিআর।তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও প্রায় প্রতিবছরই রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর ব্যতিক্রম ছিল ২০১৯-২০ অর্থবছর। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ওই অর্থবছরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঋণাত্মক ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এনবিআরের ইতিহাসে এ ধরনের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণে ব্যর্থতাঅর্থবছরের শুরুতে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা কম থাকলে সাধারণত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণে বড় ধরনের সফলতা দেখাতে পারেনি এনবিআর।তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই দশকে মাত্র সাতবার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি।২০১৪-১৫ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। পরে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ কমিয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ১০০ দশমিক ৫০ শতাংশ।পরের অর্থবছর ২০১৫-১৬ সালে মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। পরে প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় দেড় লাখ কোটি টাকা। বছর শেষে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা আদায় করে এনবিআর, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ১০২ দশমিক ৪২ শতাংশ।এরপর আর মূল কিংবা সংশোধিত—কোনো লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ করতে পারেনি রাজস্ব বোর্ড।লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে এনবিআরের ভূমিকা নেইএনবিআর কর্মকর্তাদের দাবি, রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার জন্য প্রতিবছর সংস্থাটিকে দায়ী করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে এনবিআরের কোনো ভূমিকা নেই। তাদের মতে, প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়ছে। সেই ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ ও সমীক্ষা করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে এনবিআরের সক্ষমতাও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো হচ্ছে না।কর্মকর্তারা আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পর অনেক সময় সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে। এরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে রাজস্ব আহরণে। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে রাজস্ব আহরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় রাজস্ব আদায়ও কমে যায়।৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরেড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকার বাজেট প্রণয়নের সময় ‘আয় বুঝে ব্যয়’ করার পরিবর্তে ‘ব্যয় বুঝে আয়’-এর নীতি অনুসরণ করে। ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়। কিন্তু দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেই সমস্যা থেকে যায়।তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার যথাযথভাবে ভ্যাট ও কর আদায় করতে পারছে না।তার মতে, দেশে এখনো ট্যাক্স কমপ্লায়েন্সের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। ফলে কর ফাঁকির প্রবণতা রয়েছে। একই সঙ্গে এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, বিশেষ করে ডিজিটালাইজেশনের দুর্বলতার কারণেও সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।বাড়ছে সরকারের ঋণনর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, সরকার প্রতিবছর যে বাজেট প্রণয়ন করছে তা বাস্তবসম্মত নয়। একদিকে সরকারের পারফরম্যান্স দুর্বল, অন্যদিকে উচ্চাভিলাষী বাজেটের কারণে ব্যয় প্রতিবছর বাড়ছে। কিন্তু ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় না বাড়ায় সরকারের ঋণের পরিমাণও বাড়ছে।তার দাবি, বর্তমানে সরকারের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে না পারাও সরকারের ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ।৮৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ঘাটতিসদ্য বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি আশানুরূপ না হওয়ায় পরে সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা নামিয়ে আনা হয় ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকায়।বছর শেষে এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। আর বছরের শুরুতে নির্ধারিত ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়ায় ৮৩ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।এর আগে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, অর্থবছর শেষে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারলে তারা সন্তুষ্ট হবেন। ওই লক্ষ্য পূরণেও কাজ করছিল সংস্থাটি। কিন্তু বছর শেষে সেই প্রত্যাশিত অঙ্কের চেয়েও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।টাস্কফোর্স গঠন করেও মেলেনি সাফল্যসদ্য বিদায়ী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। নতুন সরকার রাজস্ব আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর—এই তিন অনুবিভাগে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি এনবিআর।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো বা টাস্কফোর্স গঠন করলেই রাজস্ব আদায়ের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা, অর্থনীতির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে কাঠামোর মধ্যে আনা এবং এনবিআরের ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।