সিরাজগঞ্জে সরকারি বিদ্যুতের খুঁটি (পোল) ব্যবহার করে অনুমোদন ও মিটার ছাড়াই ইন্টারনেটের রাউটার ও হটস্পট ডিভাইস স্থাপন করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ‘সরকার নেট’ নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, পল্লী বিদ্যুতের খুঁটিতে সরাসরি মেইন লাইন থেকে সংযোগ নিয়ে এসব ডিভাইস পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বছরে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সায়দাবাদ ইউনিয়ন, কামারখন্দ ও বেলকুচি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম এবং হাট-বাজার এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের খুঁটিতে শত শত ওয়াই-ফাই রাউটার ও হটস্পট ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ওই তিন উপজেলায় ‘সরকার নেট’-এর প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার রাউটার ও হটস্পট সংযোগ রয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও স্বত্বাধিকারী নূরনবী শেখ পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা বৈধ চুক্তি ছাড়াই এসব ডিভাইসে বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে মেইন লাইন থেকে ‘হুকিং’ করে সরাসরি রাউটার ও হটস্পট চালানোর অভিযোগও রয়েছে।স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, একটি বাণিজ্যিক ওয়াই-ফাই রাউটার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলে দিনে গড়ে প্রায় ১ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। সে হিসাবে ১ হাজার ৫০০ রাউটারে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দাঁড়ায়। মাসে এর পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তবে রাউটারের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার ও সংযোগের ধরন যাচাই ছাড়া এই হিসাবকে আনুমানিক হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে সরকার ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কাছ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ ও মাসিক বিল বাবদ প্রতিষ্ঠানটি অর্থ আদায় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগই নয়, অনুমোদন ছাড়া বিদ্যুতের খুঁটিতে ইন্টারনেটের তার, রাউটার ও অন্যান্য ডিভাইস স্থাপন করায় নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের মূল লাইনের কাছাকাছি তার ও ডিভাইস ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এতে শর্টসার্কিট, অগ্নিকাণ্ড এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘এ বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা নেই। না জেনে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’কামারখন্দ সাব-জোনাল অফিসের এজিএম (ওএন্ডএম) বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে খুঁটিতে লাগানো এসব রাউটার বা ডিভাইসের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এসব ডিভাইসের বিপরীতে কোনো বিদ্যুৎ বিলও নেওয়া হয় না।অভিযোগের বিষয়ে ‘সরকার নেট’-এর স্বত্বাধিকারী নূরনবী শেখ দাবি করেন, তারা রাউটার পরিচালনার বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পল্লী বিদ্যুৎকে পরিশোধ করেন।তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ তার এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছে, খুঁটিতে স্থাপিত এসব রাউটার বা ডিভাইসের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং এগুলোর বিপরীতে কোনো বিদ্যুৎ বিলও নেওয়া হয় না।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-এর ১৫৪ ধারায় বিদ্যুৎ চুরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।এদিকে, সারাদেশে বিদ্যুৎ সংকট ও তীব্র গরমের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এতে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অনুমোদন ছাড়া বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহার করে ইন্টারনেটের ডিভাইস পরিচালনার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।অবৈধ সংযোগ ও ডিভাইসের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনুমোদনহীন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।