তিন দশক পেরিয়ে গেলেও চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুরহস্যের জট খোলেনি। তবে এক সময়ের চলচ্চিত্র খলনায়ক আশরাফুল হক ওরফে ডনের গ্রেপ্তারের পর ১৯৯৬ সালের আলোচিত এ মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে সামনে এসেছে। ডনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পুরোনো নথি, ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি, কথিত ১২ লাখ টাকার চুক্তি এবং পরস্পরবিরোধী তদন্ত-তথ্য আবারও আলোচনায় এসেছে।গত রোববার সৌদি আরব যাওয়ার পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সালমান শাহ হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটকে দেয়। পরে সিআইডির কর্মকর্তারা তাকে হেফাজতে নেন। আদালতে হাজির করার পর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের বাসায় ঠিক কী ঘটেছিল, সেদিন সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, কেন প্রথমে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল এবং পরে সালমান শাহর পরিবার কেন হত্যার অভিযোগে অনড় ছিল—এসব বিষয় নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।১২ লাখ টাকার চুক্তির তথ্যরাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ওই জবানবন্দিতে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা, কয়েকজনের সম্পৃক্ততা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য উঠে আসে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে।রাষ্ট্রপক্ষের বরাত দিয়ে সিআইডি সূত্র আরও জানায়, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরার সঙ্গে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পর্কের জেরে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল—এমন তথ্যও ওই জবানবন্দিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।তবে রিজভী আহমেদ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। সালমান ও শাবনূরকে ঘিরে তার দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শাবনূর তার কয়েকটি বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। প্রায় তিন দশক আগের জবানবন্দি ও সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তার কারণ কী—সিআইডি সেটিও যাচাই করবে।পরিবারের অভিযোগও গুরুত্ব পাবেসালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে হত্যার অভিযোগ করা হয়ে আসছে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন তার স্ত্রী সামিরা হক পরিবারের সদস্যদের বাসায় ঢুকতে দেননি। পরে রাতে প্রোডাকশন ম্যানেজারের মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে সালমানের লাশ সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান।এ ছাড়া সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগও পরিবারের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় করা একটি মামলায় রিজভী আহমেদ স্বীকারোক্তি দেন এবং সেখানে সামিরা ও ডনের সম্পর্কের বিষয়ও উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।পুরোনো তদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছিলসালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমানের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়।পরিবার ওই প্রতিবেদনে আপত্তি জানালে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০১৬ সালে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার ওই প্রতিবেদনেও নারাজি দেয়।২০২৫ সালে মামলায় নতুন মোড়দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরদিন রমনা থানায় ১১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়।মামলার আসামিরা হলেন—সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ।দেহাবশেষ উত্তোলন নিয়েও জটিলতাসালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল ও পুনরায় ময়নাতদন্তের বিষয়টিও মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা দেহাবশেষ উত্তোলনের আবেদন করলে আদালত তা অনুমোদন করেছিলেন। পরে বাদীপক্ষের আবেদনের পর ওই আদেশ বাতিলের বিষয়ে আদালতে প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং একাধিক প্রতিবেদনে আগের আদেশ বাতিলের কথা জানানো হয়েছে।বাদীপক্ষের যুক্তি ছিল, প্রায় তিন দশক পর দেহাবশেষ থেকে কার্যকর আলামত পাওয়ার সম্ভাবনা কম। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানানো হয়।ডনের কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সিআইডিডনের গ্রেপ্তারকে তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সিআইডি। তদন্তকারীরা তার বক্তব্যের সঙ্গে ১৯৯৭ সালের নথি, রিজভীর ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদন, পরিবারের বক্তব্য এবং নতুন মামলার এজাহারের তথ্য মিলিয়ে দেখবেন।তদন্তে ডনের কাছে ১৯৯৬ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর তার অবস্থান, সালমানের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ, সামিরা ও অন্য আসামিদের সঙ্গে তার যোগাযোগের ধরন, রিজভীর সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং কথিত ১২ লাখ টাকার চুক্তির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করা হতে পারে। অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে এর উৎস ও গন্তব্যও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।ঘটনার দিন ইস্কাটনের বাসায় যাওয়া ব্যক্তি, সালমানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে থাকা ব্যক্তি এবং পরবর্তী সময়ে তদন্ত সংস্থার কাছে বক্তব্য দেওয়া সাক্ষীদের বক্তব্যও নতুন তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতে পারে।নীলা চৌধুরীর দাবিডনের গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তবে তিনি মনে করেন, একজন এজাহারভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার হলেই তদন্ত শেষ হওয়ার সুযোগ নেই। তার দাবি, ডনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যেতে পারে।তিনি সামিরা হক, লতিফা হক লুসিসহ মামলার পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।৩০ আগস্টের দিকে তাকিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরাসিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, মামলার এজাহারভুক্ত চার নম্বর আসামি ডনের গ্রেপ্তার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা ও রহস্য উদ্ঘাটনে আইনানুগ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ডনকে হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ইতোমধ্যে আটবার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন।ডনের গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভক্তদের একটি বড় অংশ বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে রিজভীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও শাবনূরের প্রতিবাদ নিয়েও চলছে আলোচনা। দীর্ঘ তিন দশক পর নতুন তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য কতটা উন্মোচিত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।