খালেদা জিয়া: তরুণদের প্রেরণার নামসরদার ফরিদ আহমদকিছু রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতায় থাকেন, কিছু নেতা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। আবার এমন নেতাও আছেন, যারা একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তা ও কল্পনার অংশ হয়ে ওঠেন। বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার তাৎপর্য শুধু এই কারণে নয় যে তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় শক্তি ছিল তরুণদের সঙ্গে গভীর সংযোগ। নারীসমাজের কাছেও তিনি ছিলেন বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। আর তরুণদের কাছে তাঁর বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই করে এগিয়ে চলা একজন নেতা।বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী। তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতিতে আসেননি। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর পরিস্থিতির প্রয়োজনে তাঁকে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলেন। সেই পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা এবং প্রতিরোধের মানসিকতা।আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান জনআস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও এই দৃঢ়তা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আচরণেও এর প্রকাশ ঘটেছে।তরুণরা সাধারণত শুধু ক্ষমতার গল্পে আকৃষ্ট হয় না; তারা সাহসের গল্প শুনতে চায়। তারা এমন নেতৃত্ব দেখতে চায়, যে চাপের মুখে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে, জনপ্রিয়তার জন্য নীতি বদলায় না এবং পরাজয়ের পরও ঘুরে দাঁড়াতে জানে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে এসব বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান ছিল। তাই তাঁর প্রতি তরুণদের আকর্ষণকে কেবল দলীয় আনুগত্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।খালেদা জিয়া যেখানে যেতেন, সেখানে একটি আলাদা রাজনৈতিক আবহ তৈরি হতো। একে শুধু জনপ্রিয়তা বললে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের পুরোটা বোঝা যায় না। রাজনৈতিক ভাষায় এটি ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ বা ক্যারিশমা। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের নেতৃত্বতত্ত্বে ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অনুসারীদের মনে নেতার প্রতি গভীর আস্থা তৈরি হওয়া। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যক্তিত্ব, সাহস এবং সংকটের সময়ে দৃশ্যমান নেতৃত্ব মানুষের মধ্যে এমন আস্থা তৈরি করেছিল। ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু দলের সাংগঠনিক শক্তির ফল ছিল না; ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকর্ষণও এর বড় ভিত্তি ছিল।তাঁর জনপ্রিয়তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ধারণা। খালেদা জিয়া জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভাষাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তরুণদের কাছে দেশ শুধু একটি মানচিত্র নয়; দেশ মানে মর্যাদা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত, জাতীয় স্বার্থ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বক্তব্যে এসব বিষয় বারবার উঠে এসেছে। ফলে তাঁর দেশপ্রেমের ভাষা অনেক তরুণের কাছে রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ভাষায় পরিণত হয়েছিল।‘আপসহীন নেত্রী’—এই পরিচয়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই অনেকের মনে প্রথমে এই শব্দটিই আসে। অবশ্য ইতিহাসের বিচারে কোনো রাজনৈতিক নেতার জীবনই একরৈখিক নয়। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক রয়েছে, রয়েছে সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখার যে মানসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।তরুণদের কাছে এই মানসিকতার গুরুত্ব আলাদা। কারণ তরুণ বয়স প্রশ্ন করার, প্রতিবাদ করার এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানোর সময়। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রতিরোধের এই উপাদান প্রবল ছিল। বিশেষ করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর ভূমিকা তরুণদের একটি অংশকে রাজনীতিতে সক্রিয় করেছিল।পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে খালেদা জিয়ার ওপর নেমে আসে মামলা, কারাবাস ও নানা রাজনৈতিক চাপ। বয়স, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা প্রতিকূলতা—কোনোটিই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারেনি। রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়গুলোতে তাঁর দৃঢ়তা ও লড়াকু মানসিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তরুণদের একটি অংশের কাছে এখানেই তাঁর আলাদা আবেদন তৈরি হয়। তাঁদের চোখে খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন নন; দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক লড়াকু প্রতীকে পরিণত হন।এই জায়গা থেকেই জুলাই আন্দোলনের তরুণদের সঙ্গে তাঁর একটি মানসিক যোগসূত্রের বিষয়টি সামনে আসে। অবশ্য দুই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয় এবং দুই আন্দোলনের চরিত্রও অভিন্ন নয়। তবে একটি জায়গায় মিল রয়েছে—ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। জুলাইয়ের তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ, অধিকার, মর্যাদা ও ভোটের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। খালেদা জিয়াও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভোট ও নির্বাচনি বৈধতার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে জুলাই-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের একাংশের কাছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন নতুন করে পাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে।তবে পুরো তরুণসমাজকে একই রাজনৈতিক পরিচয়ে দেখা ঠিক হবে না। জুলাই আন্দোলন ছিল নানা মত ও পরিচয়ের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি গণআন্দোলন। সেই তরুণদের একটি অংশ খালেদা জিয়ার লড়াকু মানসিকতা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে—এমনটি বলা যায়। এ কারণেই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু পুরোনো দলীয় কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।খালেদা জিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের নারীদের সম্পর্কও আলাদাভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন নারী কীভাবে কয়েক দশক ধরে দেশের অন্যতম ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হলেন, সেটি নিজেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের বিষয়। তিনি শুধু নারী ভোটারদের কাছেই জনপ্রিয় ছিলেন না; অনেক নারী তাঁকে দেখেছেন দৃঢ়চেতা ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন নারী হিসেবে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও দৃঢ় থাকার মানসিকতা নারীদের একটি অংশের মধ্যে বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করেছে।খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্বাচনি রাজনীতি। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় পাওয়ার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, পরাজয় মেনেছেন এবং আবার জয়ী হয়েছেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি যে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সবগুলোতেই জয়ী হয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত ভোট-আকর্ষণের ক্ষেত্রে এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়।তরুণদের একটি অংশ তাই তাঁর মধ্যে শুধু একজন দলীয় নেত্রীকে দেখেনি; দেখেছে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখকে। রাজপথের আন্দোলন ও ব্যালটের বাক্স—দুই ক্ষেত্রেই সক্রিয় একজন রাজনৈতিক নেতাকে তারা দেখেছে। এই দুই ধারার সমন্বয় তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে।তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শুধু আবেগ দিয়ে মূল্যায়ন করলে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। তাঁর শাসনামলের সাফল্যের পাশাপাশি সংসদীয় রাজনীতিতে সংঘাত, রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয়করণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো প্রশ্নও রয়েছে। একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়নে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—দুটোকেই বিবেচনায় নিতে হয়। সমালোচনা থাকলেও মানুষের মনে কোনো নেতার গভীর প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না।আজ খালেদা জিয়া নেই। তাঁর জন্মদিনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাঁর বয়স নয়, তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। নতুন প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে কী নেবে? শুধু একটি দলের রাজনৈতিক স্লোগান, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস? শুধু একটি পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস, নাকি ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা?সময় বদলায়, রাজনৈতিক প্রজন্ম বদলায়, নেতৃত্ব ও স্লোগানও বদলায়। কিন্তু কিছু মূল্যবোধ টিকে থাকে—সাহস, আত্মমর্যাদা, দেশপ্রেম, ভোটের অধিকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যদি তরুণদের কাছে কোনো অর্থ বহন করে, তবে তা এসব মূল্যবোধের জায়গাতেই।তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিন তাই কেবল স্মরণের দিন নয়, মূল্যায়নেরও দিন। ফুল, ব্যানার, মিছিল ও বক্তৃতার বাইরে খালেদা জিয়াকে নতুন করে পড়ার দিন—বিশেষ করে তরুণদের চোখ দিয়ে। কারণ যে নেতা একটি প্রজন্মকে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব জীবদ্দশার সীমা অতিক্রম করে। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বড় সত্য। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর লড়াইয়ের গল্প এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়। আর যতদিন সেই গল্প তরুণদের প্রশ্ন করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং ভোটের শক্তিতে বিশ্বাস করতে অনুপ্রাণিত করবে, ততদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার নাম শুধু অতীতের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে না।লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন