ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। ইশতেহারে ঘোষিত ৯টি অগ্রাধিকারকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর গত ১৮০ দিনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ক্রীড়া, পরিবেশ, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি বলেছিল, জনগণের ভোটে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করা হয়।সরকার গঠনের পর ইশতেহারের ৯টি অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাকে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।ফ্যামিলি কার্ড চালুপ্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। কার্ডধারীদের প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।কৃষক কার্ডে সুবিধাকৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণের সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি এবং কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও এ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।স্বাস্থ্য খাতে মানবিক ব্যবস্থাদুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।শিক্ষায় কর্মমুখী পরিবর্তনআনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে। বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নতরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে তরুণদের যুক্ত করা এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলাক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষাপরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতিদেশে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করতে বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা পেপাল চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব প্রতিষ্ঠা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার সময় বিএনপির ৩১ দফা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়। জাতি গঠন ও গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করতে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ৯টি অগ্রাধিকার খাতের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠাকেও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইশতেহারের ৯টি অগ্রাধিকারকে আলাদা কোনো কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনমুখী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।তবে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোকে আরও বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষের কাছে কার্যকর সুফল পৌঁছে দেওয়াই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনি ইশতেহারকে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ভিত্তি হিসেবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা আগামী দিনে সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠবে।