বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা করা উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম। তাঁর মতে, অনার্সের শেষ বর্ষে এসে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে ধারণা নিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হওয়া জরুরি।২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন মাজহারুল ইসলাম। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে নিজের দায়িত্ব পালন, অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।মাজহারুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরির প্রতি বেশি আগ্রহী হলেও কর্মক্ষেত্রে সুযোগের পরিধি অনেক বিস্তৃত। শিক্ষার্থীদের শিল্প খাত, করপোরেট চাকরি, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন সুযোগ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু বিসিএসকেন্দ্রিক চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া-গভর্নমেন্ট সংলাপ, করপোরেট সংযোগ, উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সেমিনার ও গবেষণামুখী কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছে। একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের প্রথমেই নিজেদের পছন্দ ও সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে অনুসন্ধান করার পরামর্শ দেন মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে চান, সেখানে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন এবং কীভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে। ক্যারিয়ার লক্ষ্য নির্ধারণে ছয় মাস বা এক বছর সময় লাগলেও সমস্যা নেই। তবে লক্ষ্য নির্ধারণের পর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে।দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ স্কিল সামিট, ইয়ুথ এমপ্লয়াবিলিটি সামিট, স্টুডেন্ট রিসার্চ কনফারেন্স ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলার মতো বিভিন্ন আয়োজনের কথা তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষার্থীদের জন্য আটটি ব্যাচে বিনা মূল্যে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন হল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সফট স্কিল উন্নয়নবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা হয়।মাজহারুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে হলভিত্তিক কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টার্নশিপ, ইনোভেশন হাব, জব ফেয়ার ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি হলে আইটি অ্যান্ড ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি হলে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, এর বড় একটি অংশ কাঠামোগত। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি ক্যারিয়ারমুখী হয়ে উঠতে পারেনি। ব্যক্তিগত পর্যায়েও ক্যারিয়ার লক্ষ্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ে।তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের এটুআই-এর সঙ্গে একটি বড় জব ফেয়ার আয়োজনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। একইভাবে বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে ই-লাইব্রেরি চালুর উদ্যোগও ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি।বাজেট ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন মাজহারুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, অনেক সময় স্পন্সর চূড়ান্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে তারা সরে গেছে। ফলে সীমিত সম্পদ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবেও আর্থিক চাপ নিতে হয়েছে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি।শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াকে নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে মাজহারুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন জরিপে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাঁর কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এ ধরনের সাড়া তাঁকে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।মেয়াদের বাকি সময়ে হলগুলোতে ক্যারিয়ার ল্যাব স্থাপন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, সেমিনার আয়োজন এবং টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চালুর বিষয়ে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ডাকসু নেতৃত্বের জন্য একটি কার্যকর মানদণ্ড রেখে যেতে চান, যাতে পরবর্তী নেতৃত্ব সেটিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা, গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আরও সোচ্চার হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয়ে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নেও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দিতে হবে।