উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলা। প্রতিদিন উত্তরবঙ্গের অন্তত ১১টি জেলার যানবাহন এ জেলার ওপর দিয়ে চলাচল করে। ফলে বগুড়া থেকে উত্তরাঞ্চলগামী মহাসড়কগুলো ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত থাকে। তবে এ মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনাও।পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২০৬ জন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ জন। অথচ ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ১২০।এসব দুর্ঘটনায় অনেক পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ও তরুণ রয়েছেন। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণরা অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।ট্রাফিক পুলিশ জানায়, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঘোগা ব্রিজ ও ধুনট মোড়, নন্দীগ্রাম উপজেলা বাসস্ট্যান্ড ও কুন্দারহাট, শাজাহানপুরের শাকপালা, ছিলিমপুর, বনানী ও লিচুতলা, দুপচাঁচিয়া বাসস্ট্যান্ড, বগুড়া সদরের চারমাথা, তিনমাথা ও বারোপুর, শিবগঞ্জের মহাস্থান ও মোকামতলা, মাটিডালি দ্বিতীয় বাইপাস এবং সাবগ্রাম এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। কখনো দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে ধাক্কা, কখনো বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, আবার কখনো মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও নসিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।বাস-ট্রাক শ্রমিক ও অটোরিকশা চালকরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে এক পক্ষ সতর্ক থাকলেও অপর পক্ষের বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন দুর্ঘটনার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া মহাসড়কে সিএনজি ও মোটরসাইকেল চালকরা সংযোগ সড়ক ব্যবহার না করে সরাসরি মূল সড়কে ওঠায় ঝুঁকি বাড়ছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার অভাব, যেখানে-সেখানে যানবাহন পার্কিং, নিদ্রাহীন অবস্থায় গাড়ি চালানো, অনভিজ্ঞ চালক, ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন, গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, হেলমেট না পরা, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, বাস ও ট্রাকে অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জেলার ১২টি থানায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সদর থানায় ২৬টি, শেরপুরে ২১টি, শাজাহানপুরে ১৮টি এবং শিবগঞ্জ থানায় ১৫টি মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২৫।হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিয়নের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় গত বছর মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ২৪৬ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৯৯টি।অপরদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে এই পাঁচ জেলায় ২১২টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় ১৮৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২০৬ জন। মাসভিত্তিক নিহতের সংখ্যায়—জানুয়ারিতে ২১, ফেব্রুয়ারিতে ২৭, মার্চে ৩৬, এপ্রিলে ২৭, মে মাসে ৩৭, জুনে ২৮ এবং জুলাইয়ে ৩০ জন।বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ (প্রশাসন) টিআই মো. সালেকুজ্জামান খান বলেন, মহাসড়ককেন্দ্রিক জেলা হওয়ায় বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ট্রাফিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ না হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।