সীতাকুণ্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু; নমুনা পাঠানো হয়েছে ঢাকার ল্যাবে।সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে গ্যাসমুক্ততার সনদ ও সরকারি ছাড়পত্র থাকা একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি কীভাবে ঘটল—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে সেফটি ইনচার্জসহ ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একাধিক সরকারি তদন্ত কমিটি কাজ করছে।দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির ভেতরের তরল, বাতাস ও রাসায়নিক উপাদানের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।নথিপত্র অনুযায়ী, দুবাই থেকে জাহাজটি কেনার সময় মূল মালিকপক্ষের কাছ থেকে গ্যাসমুক্ততার ক্লিন সার্টিফিকেট নেওয়া হয়। বাংলাদেশে আনার পর বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও অনুমোদনও নেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রায় ১০ মাস ধরে জাহাজটির কাটিং কার্যক্রম চলছিল।এরই মধ্যে জাহাজটির বড় একটি অংশ এবং ৪ নম্বর ব্যালাস্ট ট্যাংকের কাটিং নিরাপদে শেষ হয়। পরে ৩ নম্বর ব্যালাস্ট ট্যাংকে ফ্লেম কাটিং শুরু করার পর হঠাৎ বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই সনদপ্রাপ্ত সেফটি ইনচার্জসহ ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়।নিহতদের মধ্যে ইয়ার্ডের প্রশিক্ষিত সেফটি ইনচার্জ ছিলেন। অন্য শ্রমিকদের অনেকেরই ১১ থেকে ১৭ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। ফলে শ্রমিকদের অসতর্কতা কিংবা অভিজ্ঞতার ঘাটতিকে এককভাবে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।তদন্তে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস তৈরির সম্ভাব্য উৎসের ওপর। আবদ্ধ পানির পচনপ্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো কোনো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়েছিল কি না, কিংবা ফ্লেম কাটিংয়ের তাপে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে গ্যাস সৃষ্টি হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাটিংয়ের আগে গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, ট্যাংকের ভেতরে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ছিল কি না এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ণয় করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের সনদপ্রাপ্ত একটি ইয়ার্ডে ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে কীভাবে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হলো, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।সংগঠনটির সাবেক সহসভাপতি মো. কামাল উদ্দিনও শ্রমিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর মতে, জাহাজ কেনার সময় ক্লিন সার্টিফিকেট এবং দেশে আনার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অনুমোদন থাকার পরও কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনা প্রয়োজন।এদিকে দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন এসএল স্টিলের মালিক মোহাম্মদ লোকমান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। একটি দুর্ঘটনার কারণে পুরো শিল্প বা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়।তিনি জানান, ইয়ার্ড বন্ধ থাকলেও প্রায় ২০০ শ্রমিকের বেতন এবং ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও করেন তিনি।মোহাম্মদ লোকমানের দাবি, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।সীতাকুণ্ডের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দেশের ইস্পাত খাতের অন্যতম প্রধান কাঁচামালের উৎস। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনার পর শিল্প পুরোপুরি বন্ধ না রেখে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি, কঠোর গ্যাস পরীক্ষা, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান কার্যকর করা প্রয়োজন।তবে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এখন মূল অপেক্ষা তদন্ত ও ল্যাবরেটরি প্রতিবেদনের। ক্লিন সার্টিফিকেট, সরকারি ছাড়পত্র, গ্যাস পরীক্ষার নথি, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রটোকল—সবকিছু যাচাইয়ের পাশাপাশি ল্যাব রিপোর্টই হয়তো স্পষ্ট করবে, গ্যাসমুক্ত সনদ থাকা জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে কীভাবে প্রাণঘাতী গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছিল এবং সেই গ্যাসই কীভাবে মুহূর্তে কেড়ে নিল ১০ শ্রমিকের প্রাণ।