সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর পর বিএসবিআরএর শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভচট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় শিপইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার পর নিহত শ্রমিকদের স্বজন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিক এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কর্মীদের পাশে সংগঠনের বর্তমান শীর্ষ নেতাদের দেখা না যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।১৪ আগস্ট ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা একটি পুরোনো জাহাজের ট্যাংকের ভেতরে কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ট্যাংকে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, গ্যাস-ফ্রি সনদ নেওয়া হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল কি না এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—এসব বিষয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।দুর্ঘটনার পর বিএসবিআরএর সভাপতি মহসিন চৌধুরীসহ সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষ নেতার উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন নেতার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের বাসভবনে খোঁজ নিয়েও অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংগঠনের সভাপতি মহসিন চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত একটি বিদেশি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার দিন বিএসবিআরএর সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী সারাদিন ঘটনাস্থলে থেকে সহযোগিতা করেছেন। তবে বর্তমান সভাপতি মহসিন চৌধুরীসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সেখানে দেখা যায়নি। রাতেও তারা ঘটনাস্থলে আসেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা মারধরের শিকার হন এবং বহিরাগতদের কেউ কেউ মালামাল নিয়ে যায়।মাদার স্টিল শিপইয়ার্ডের মালিক মাস্টার আবুল কাশেম বলেন, জনরোষের আশঙ্কায় কমিটির সভাপতি ও অন্য নেতারা ঘটনাস্থলে আসেননি। বিএসবিআরএর সাবেক সহ-সভাপতি ও জনতা স্টিল শিপইয়ার্ডের মালিক কামাল উদ্দিনও এত বড় দুর্ঘটনার পর সংগঠনের সভাপতি ও শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেন।অন্যদিকে, ঝুঁকি নিয়ে সাতটি মরদেহ উদ্ধারকারী সাইফুল গনি বলেন, উদ্ধারকাজ করতে গিয়ে তারা নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর বিএসবিআরএর সভাপতি বা সংগঠনের কোনো নেতা তাদের কিংবা নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের খোঁজ নেননি।এদিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বিএসবিআরএর পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্তে বিষাক্ত গ্যাসের উৎস ও মাত্রা, গ্যাস পরীক্ষার রেকর্ড, গ্যাস-ফ্রি সনদের বৈধতা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।শ্রমিকদের স্বজন ও উদ্ধারকর্মীদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রভাবমুক্ত তদন্তের মাধ্যমে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহত ও উদ্ধারকর্মীদের সুচিকিৎসা এবং শিপইয়ার্ডগুলোতে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।১০ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা ও মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। তদন্তে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।