জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বে আনার আহ্বান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলেরবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংগঠন পরিচালনায় তৃণমূলের দায়িত্বশীলদের অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। আদর্শ আচরণের মাধ্যমে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সংগঠন ও নেতৃত্বে সম্পৃক্ত করার কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে।বৃহস্পতিবার রংপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী উপজেলা ও থানা দায়িত্বশীল শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট রংপুর বড় আলিয়া মাদ্রাসায় এ শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়।রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শিক্ষাশিবিরে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম। বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সহকারী অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেন।জ্ঞান-প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ হওয়ার আহ্বানমিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। পরিবার গঠনের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে স্ত্রী-সন্তানরা ইসলামী আন্দোলনের জন্য গড়ে ওঠে এবং আন্দোলনের সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নসহ স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে।বিগত নির্বাচনে রংপুরের জনগণ জামায়াতের প্রার্থীদের নির্বাচিত করে যে আস্থা রেখেছেন, তার মর্যাদা রাখতে এমপিদের কাজ ও জনগণের সেবার মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, নৈতিক স্খলন ও দুর্বলতা থেকে সংগঠনের জনশক্তিকে রক্ষা করতে তাদের মানোন্নয়ন জরুরি। ফ্যাসিস্ট আমলে মজলুম ও শহীদ নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ এবং দুঃখ-কষ্টের মূল্যায়ন করে নিজেদের ত্যাগ ও কোরবানির ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।তিনি বলেন, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন, কর্মী পরিচালনা এবং জনগণের সঙ্গে সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে জুলাই সনদ প্রসঙ্গএদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর মহানগর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। মহানগর আমির এটিএম আজম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি বলেন, জনদুর্ভোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও দলীয়করণের পাশাপাশি বড় সংকট হলো—২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় সরকার মেনে নেয়নি।তিনি বলেন, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংবিধানে নেই—সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ কর্তৃত্ববাদী সরকার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে।সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরিতে সব দলের লোকজনই চাকরি করবেন এবং এ ক্ষেত্রে নিয়োগবিধি রয়েছে। রাজনৈতিক পদে থাকা ব্যক্তিদের সরকারি পদে নিয়োগ দেওয়া যায় না। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত সরকার না থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন পদে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই দায়িত্ব পালন করার কথা।তার অভিযোগ, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে বিএনপি সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা প্রমাণ করে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নয়, বরং ‘সবার আগে বিএনপি’।গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে হারিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সরকারের পরাজিত প্রার্থীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় নির্বাচিত এমপিদের কাজের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। সংরক্ষিত নারী এমপিদের নির্বাচিত বিরোধীদলীয় এমপিদের এলাকায় অসাংবিধানিকভাবে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।১১ দলের লংমার্চ ৫ সেপ্টেম্বরজামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বিএনপি গণভোটে রায় দেওয়া পাঁচ কোটি মানুষের সঙ্গে দ্বিচারিতা করছে। গণভোটের আগে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে এখন তা অস্বীকার করা হচ্ছে। বিএনপিকে সংসদে স্পষ্ট করতে হবে, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি।তিনি বলেন, বিএনপির প্রস্তাবেই গণভোট হয়েছে এবং তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছে। কিন্তু ভোটের পর ক্ষমতায় এসে এখন বলছে, এসব সংবিধানবিরোধী। জনগণকে বিভ্রান্ত করার এই ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ মানুষ বুঝতে পারছে। সরকার জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে।সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া উচিত এবং জনগণের প্রতি দেওয়া ওয়াদা পালন করা উচিত। দেশে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না করে সংসদে জুলাই সনদসহ সব বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। তাদের রাজপথে ঠেলে দেওয়া হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষকে রাজপথে নামা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।তিনি বলেন, জুলাই সনদের পক্ষে জনমত ধরে রাখা এবং এর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ছয় মাস ধরে ১১ দল সংসদে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচি পালন করেছে। জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে দফায় দফায় মিছিল, বিক্ষোভ ও মহাসমাবেশ হয়েছে।আন্দোলনের তৃতীয় পর্ব শেষে চতুর্থ পর্বে লংমার্চের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে প্রথম লংমার্চ শুরু হবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বড় সমাবেশের মাধ্যমে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ শুরু হবে।লংমার্চে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এবং শহীদ আবু সাঈদের রক্তের স্মৃতিবিজড়িত উত্তরবঙ্গের জনপদ রংপুরের লংমার্চ সফল করতে জনগণকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।শিক্ষাশিবিরে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা ও পরিচালনায় অংশ নেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও মহানগর আমির মাওলানা এটিএম আজম খান, অঞ্চল টিম সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এমপি, সাবেক কুড়িগ্রাম জেলা আমির মাওলানা আবদুল মতিন ফারুকী, লালমনিরহাট জেলার সাবেক আমির অ্যাডভোকেট আবদুল বাতেন, প্রভাষক আতাউর রহমান, রংপুর মহানগর সেক্রেটারি কেএম আনোয়ারুল হক কাজল ও রংপুর জেলা সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হকসহ অনেকে।