ছয় মাসেও প্রকাশ্যে আসেননি; নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্নইরানে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা সাইয়েদ মুজতবা খামেনির কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা সরাসরি অডিও বার্তা প্রকাশ্যে আসেনি। গুরুতর আহত অবস্থায় ক্ষমতার শীর্ষে আসা মুজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কি সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, নাকি ইরানের নেতৃত্ব কার্যত অন্যদের হাতে চলে গেছে?ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ্যে না এলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মুজতবাই নিচ্ছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও সংশয় বাড়ছে।হামলার পর থেকেই আড়ালেইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই তাঁর ছেলে মুজতবা খামেনিকে দেশের সর্বোচ্চ নেতা করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার সময় মুজতবাও গুরুতর আহত হন। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ওই হামলায় তাঁর মুখমণ্ডল বিকৃত হয়েছে।এরপর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি গত মাসে বাবার জন্য আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। ইরানিদের উদ্দেশে তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশিত বার্তাগুলোও সীমিত ছিল লিখিত বিবৃতিতে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সংবাদ পাঠকেরা সেসব বিবৃতি পড়ে শোনান।নিরাপত্তার কারণ দেখাচ্ছে সরকারইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, মুজতবার নিরাপত্তার কারণেই তাঁর অবস্থান গোপন রাখা হচ্ছে। অবস্থান প্রকাশ পেলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল তাঁকে লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুব অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা সরাসরি মুজতবার সঙ্গে দেখা করতে পারছেন। তবে তিনি নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন পাচ্ছেন এবং বড় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছেন।ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত ১০ আগস্ট দাবি করেন, তিনি মুজতবার সঙ্গে টানা সাত ঘণ্টা বৈঠক করেছেন।মুজতবার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রও জানিয়েছে, তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তিনি মানসিকভাবে সজাগ এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন।আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, যুদ্ধ ও নানা চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় সেবা কার্যক্রম সচল রয়েছে, পররাষ্ট্রনীতিতে ঐক্য বজায় আছে এবং সরকারের সিদ্ধান্তগুলোও সুসংগত। এসবই প্রমাণ করে যে সর্বোচ্চ নেতা এখনো দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন।সমর্থকদের মধ্যেও সংশয়সরকারের এসব বক্তব্যের পরও ইরানের ভেতরে সংশয় বাড়ছে। এমনকি কট্টরপন্থী সমর্থকদের মধ্যেও মুজতবার দৃশ্যমান উপস্থিতির দাবি উঠেছে।ধর্মীয় নগরী কোমের বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর এক সদস্য বলেন, দেশের নেতৃত্বে মুজতবা আছেন—এ বিষয়ে মানুষের আস্থা বাড়াতে অন্তত তাঁর কণ্ঠ শোনা বা উপস্থিতির কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ প্রয়োজন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন মুজতবাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর একটি ছবিও প্রকাশ্যে না আসায় মানুষের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা ইরানের স্বার্থের জন্য ভালো নয়।সংস্কারপন্থীদের মধ্যে সংশয় আরও তীব্র। তেহরানের ব্যবসায়ী শাহরোখ বলেন, ‘আমরা কীভাবে জানব মুজতবা নিহত হননি?’ তাঁর মতে, মুজতবা জীবিত আছেন—এমন দৃশ্যমান প্রমাণ যেমন নেই, তেমনি তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত আছেন—এরও কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।ক্ষমতার কেন্দ্রে রেভল্যুশনারি গার্ডছয় মাসের যুদ্ধে ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো এখনো ভেঙে পড়েনি। সামরিক বাহিনীও আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।এ অবস্থায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির প্রভাব আরও বেড়েছে বলে দেশটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাহিনীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।সূত্রগুলোর মতে, ক্ষমতার কাঠামো এখন অনেকটাই সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠিত হয়েছে। এর শীর্ষ পর্যায়ে রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন।রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মুজতবা এসব শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তাঁর কাছ থেকেই আসছে।অর্থনীতিতেও বাড়ছে চাপদীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। কয়েক মাস ধরে তেল রপ্তানিতে বাধা এবং যুদ্ধের বিপুল ব্যয় দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্যকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ দমন করেছিল সরকার। ওই সময় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার দাবি রয়েছে।এ পরিস্থিতিতে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা, সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক সংকট যাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করা।‘নেতৃত্বের শূন্যতা’ নিয়ে সতর্কতাওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকার মতে, মুজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি এখন শুধু তাঁর জীবিত থাকা নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কোনো সমঝোতায় যাওয়া কিংবা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মুজতবার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র নিজেদের মতো করে দাবি করতে পারে—সর্বোচ্চ নেতা আসলে কী চান।যুদ্ধের আগেও মুজতবা খামেনি অনেকটাই আড়ালে থেকে কাজ করতেন। বাবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতির চেয়ে নেপথ্যের ভূমিকাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তবে এখন তিনি এমন একটি পদে রয়েছেন, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার কণ্ঠ ও দৃশ্যমান উপস্থিতিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, মুজতবার নীরবতা ততই ইরানের নেতৃত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।