কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও তাঁর পারিবারিক জীবনের কিছু অধ্যায় এখনো অনেকটাই অজানা। তেমনই এক রহস্যঘেরা নাম শান্তিলতা দেবী—কবির পালিত কন্যা হিসেবে যাঁর পরিচয় দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল। প্রচলিত বহু জীবনীতে তাঁর উল্লেখ নেই; এমনকি কবির নিজের লেখাতেও শান্তিলতাকে নিয়ে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না।এই বিস্মৃত চরিত্রটিকে নতুন করে আলোচনায় আনেন লেখক শেখ দরবার আলম। তাঁর ‘নজরুল জীবন ও পালিত কন্যার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে শান্তিলতা দেবীর স্মৃতিচারণের মাধ্যমে নজরুলের পারিবারিক জীবনের এক অনুল্লিখিত অধ্যায় সামনে আসে।১৯৮৭ সালের ২৬ মে, মঙ্গলবার, লেখক প্রথমবার শান্তিলতা দেবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর দুই দিন পর ঢাকার বনানীতে কবির নাতনি খিলখিল কাজীর বাসায় শুরু হয় দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। প্রায় তিন ঘণ্টার সেই আলাপ দুটি ৯০ মিনিটের টিডিকে অডিও ক্যাসেটে ধারণ করা হয়। পরে ১৯৮৯ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত দৈনিক ইনকিলাবের ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ পাতায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় সাক্ষাৎকারটি। এর মধ্য দিয়েই নজরুলের পালিত কন্যা হিসেবে শান্তিলতা দেবীর নাম প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।শান্তিলতা দেবীর প্রকৃত নাম শান্তিলতা সেনগুপ্তা। তিনি কবির স্ত্রী আশালতা সেনগুপ্তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়া। তাঁর ভাই বিজয় সেনগুপ্তও নজরুল পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কমরেড মুজফ্ফর আহমদের ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথায়’ বিজয় সেনগুপ্তের উল্লেখ রয়েছে। কবি বিজয়কে আদর করে ‘খোকা’ নামে ডাকতেন। আর শান্তিলতার ভাষ্য অনুযায়ী, কবি তাঁকে ডাকতেন ‘খুকু’ বলে।শান্তিলতার বাবা ছিলেন নিবারণ সেনগুপ্ত। মা সুশীলা দেবী বজবজের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শান্তিলতাও একই স্কুলে শিক্ষকতা করেন এবং মায়ের স্থলাভিষিক্ত হন। তবে জীবনের শেষদিকে শিক্ষাগত যোগ্যতার অজুহাতে তিনি চাকরি হারান। এরপর মামলা-মোকদ্দমার জটিলতায় ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে নজরুলের পরিবারেই তিনি আশ্রয় পান।বিয়ের পর তাঁর নাম হয় শান্তিলতা দাশগুপ্তা। তাঁর বাবার পদবি এবং কবির শ্বশুরকুলের পদবি একই—সেনগুপ্ত। তাঁর ভাই বিজয় সেনগুপ্তও কোনো একসময় নজরুলের পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন।নজরুলের সংসারে শান্তিলতার আগমনশান্তিলতা দেবীর মায়ের বাড়ি ছিল ফরিদপুরে। মাত্র ছয়-সাত বছর বয়সে বিধবা মায়ের সঙ্গে বেড়াতে এসে তিনি নজরুলের সংসারে আসেন। তখন নজরুল ছিলেন যুবক। সদ্যবিবাহিত স্ত্রী আশালতা সেনগুপ্তাকে নিয়ে তাঁর সংসার গড়ে উঠছিল, একে একে জন্ম নিচ্ছিল তাঁদের সন্তানরা।১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতার ৬ নম্বর হাজি লেনের বাড়িতে মাতৃসমা মিসেস এম রহমানের উদ্যোগে নজরুল ও আশালতার বিয়ে হয়। পরের বছর ১১ আগস্ট হুগলির চকবাজারের ‘রোজ ভিলা’য় জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান আজাদ কামাল, ডাকনাম কৃষ্ণ মুহম্মদ।এরপর ১৯২৬ সালের ৯ অক্টোবর কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের গ্রেস কটেজে জন্ম নেয় তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালিদ, যিনি ‘বুলবুল’ নামে পরিচিত ছিলেন।এই গ্রেস কটেজেই বুলবুলের জন্মের পর নজরুল পরিবারের সঙ্গে শান্তিলতা দেবীর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সাক্ষাৎকারে শান্তিলতা নিজে বলেছিলেন, বুলবুলের জন্মের দুই থেকে আড়াই বছর পর তিনি নজরুলের পরিবারে থাকতে শুরু করেন। তবে ঘটনাপ্রবাহ ও ঐতিহাসিক সময়রেখা বিবেচনায় দেখা যায়, নজরুল ১৯২৮ সালের ৯ এপ্রিল কৃষ্ণনগর ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ফলে শান্তিলতার সেই আগমন ১৯২৮ সালের ৯ এপ্রিলের আগেই হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়।এরই মধ্যে ১৯২৮ সালের ২৮ মে চুরুলিয়ায় ৫৫ বছর বয়সে মারা যান নজরুলের মা জাহেদা খাতুন। তখন নজরুলের পরিবার থাকত কলকাতার ১১ ওয়েলেস্লি স্ট্রিটে।পরের বছর ৯ অক্টোবর কলকাতার পানবাগান লেনের ৮/১ নম্বর বাড়িতে জন্ম নেয় নজরুলের তৃতীয় পুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলাম। কিন্তু পারিবারিক জীবনে এরপর নেমে আসে একের পর এক শোক ও সংকট।১৯৩০ সালের ৭ মে বসন্ত রোগে মাত্র তিন বছর বয়সে মারা যায় বুলবুল। তখন নজরুলের ঠিকানা ছিল ৫০/২এ, মসজিদবাড়ি স্ট্রিট। মৃত্যু, দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার নানা অভিঘাতের মধ্যেও নজরুলের পরিবারে তখন ছিলেন ছোট্ট শান্তিলতা।নজরুলের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা?নজরুলের জীবনের নানা ঘটনা ও কথাবার্তায় একটি কন্যাসন্তানের প্রতি তাঁর গভীর আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সে কারণে শান্তিলতা সেনগুপ্তার নজরুল পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনাকে অনেকে কবির সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার এক ধরনের পূরণ হিসেবে দেখেন।তবে এর পাশাপাশি প্রশ্নও থেকে যায়—তাহলে বিজয় সেনগুপ্তের অবস্থান কী ছিল? তিনিও তো নজরুল পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও পরিবারের একজন আপনজনের মতোই সেখানে অবস্থান করতেন।শান্তিলতা দেবীর সাক্ষাৎকারে নজরুল ও আশালতার পারিবারিক জীবনের নানা অনুল্লিখিত দিক উঠে এসেছে। তাঁদের দৈনন্দিন সম্পর্ক, পারস্পরিক টানাপোড়েন, স্নেহ-মমতা এবং জীবনের নানা কষ্টের গল্প এসব স্মৃতিচারণে ধরা পড়ে।এসব বয়ান নজরুলকে শুধু বিদ্রোহী কবি হিসেবে নয়, একজন স্বামী, পিতা ও স্নেহশীল মানুষ হিসেবেও দেখার সুযোগ করে দেয়। তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের মানবিক দিকটি এতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।দীর্ঘ কয়েক দশক পর শেখ দরবার আলমের অনুসন্ধান, শান্তিলতা দেবীর স্মৃতিচারণ এবং দুটি অডিও ক্যাসেটে সংরক্ষিত কথোপকথনের সূত্র ধরে নজরুলজীবনের আড়ালে থাকা এই অধ্যায় আবারও সামনে এসেছে। হারিয়ে যাওয়া সেই নাম—শান্তিলতা দেবী—আজ তাই নজরুলের পারিবারিক জীবনের এক কৌতূহলোদ্দীপক ও মানবিক অধ্যায়ের অংশ।লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক