অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরাইলি বসতির সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত অন্তত ১৭টি কোম্পানির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সরকারি খাতের ১২৫টি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির সম্মিলিত মূল্য ২ দশমিক ১২৯ বিলিয়ন পাউন্ড, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার।আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির ১৪০ জনের বেশি এমপি অবৈধ ইসরাইলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি বিবেচনা করছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।আল-জাজিরা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথি, কোম্পানি নিবন্ধন নথি ও করপোরেট তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পেয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবৈধ ইসরাইলি বসতির সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত সহযোগী কোম্পানিও যুক্তরাজ্যের সরকারি খাত থেকে বড় অঙ্কের চুক্তি পেয়েছে।চুক্তিগুলোর মধ্যে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন, জরুরি সেবা ও ড্রাইভিং লাইসেন্স-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ রয়েছে।লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রিজ আল-জাজিরাকে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অব্যাহত রাখার ফলে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে।টাসেলের সংগৃহীত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানে চিহ্নিত ১৭টি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সরকারি খাতের ১২৫টি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির মোট মূল্য ২ দশমিক ১২৯ বিলিয়ন পাউন্ড।মোটোরোলার চুক্তিই ১.৭ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশিএই অর্থের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান মোটোরোলা সলিউশনসের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি থেকে এসেছে। এসব চুক্তির মূল্য ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। এর বড় অংশই যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান এয়ারওয়েভ সলিউশনের।মোটোরোলা সলিউশনসের বিরুদ্ধে অবৈধ ইসরাইলি বসতির নিরাপত্তা অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে বসতিতে নিরাপত্তাসেবা, সরঞ্জাম ও উপকরণ সরবরাহ এবং বসতিগুলোর অস্তিত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণে সহায়ক সেবা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।যুক্তরাজ্যে মোটোরোলার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি সেবার জন্য যোগাযোগ সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চুক্তিটি এয়ারওয়েভ সলিউশনের সঙ্গে।যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এয়ারওয়েভকে ১ দশমিক ৫৬২ বিলিয়ন পাউন্ডের একটি চুক্তি দিয়েছে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নিরাপদ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সরবরাহের মেয়াদ বাড়াতে এ চুক্তি করা হয়েছে।এ ছাড়া মোটোরোলা সলিউশনস ইউকের আরও ১২৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন পাউন্ডের সরকারি চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি চুক্তিও রয়েছে।সর্বশেষ টাসেল তথ্য অনুযায়ী, মোটোরোলা সলিউশনসের নিয়ন্ত্রণাধীন পাঁচটি কোম্পানি—এয়ারওয়েভ সলিউশনস, মোটোরোলা সলিউশনস ইউকে, সিআরএফএস, থ্রিটিসি সফটওয়্যার ও নাগিন আইটি—যুক্তরাজ্যের সরকারি খাতে ৯১টি সক্রিয় চুক্তি ধরে রেখেছে। এসব চুক্তির মোট মূল্য ১ দশমিক ৭২৬ বিলিয়ন পাউন্ড।মোটোরোলা সলিউশনস এবং এর ইসরাইলি সহযোগী প্রতিষ্ঠান মোটোরোলা সলিউশনস ইসরাইলকে ২০২০ সালে জাতিসংঘের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ তালিকাতেও প্রতিষ্ঠান দুটির নাম রয়েছে।আল-জাজিরা মন্তব্যের জন্য মোটোরোলা সলিউশনসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দেয়নি।পশ্চিম তীরে খনি নিয়ে হাইডেলবার্গজার্মান নির্মাণসামগ্রী প্রতিষ্ঠান হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালসও জাতিসংঘের ওই তালিকায় রয়েছে। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে যুক্ত করা হয়েছে।যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি কোম্পানির ২৫টি সরকারি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির মোট মূল্য ১৮৪ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে হ্যানসন কোয়ারি প্রোডাক্টস ইউরোপের সঙ্গে রয়েছে ১৭৯ দশমিক ০৩ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি।ওয়েস্টমোরল্যান্ড অ্যান্ড ফার্নেস কাউন্সিলের সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কের কাজের জন্য হ্যানসনের ৬০ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি চুক্তি রয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত এ চুক্তির মেয়াদ। এ ছাড়া সামারসেট কাউন্সিলের সঙ্গে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি রয়েছে।হাইডেলবার্গের ইসরাইলি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হ্যানসন ইসরাইল পশ্চিম তীরে কালকিলিয়ার দক্ষিণে নাহাল রাবা খনির মালিক। হু প্রফিটসের তথ্য অনুযায়ী, খনিটি আজ-জাওয়িয়া ও রাফাত নামে দুটি ফিলিস্তিনি গ্রামের জমিতে অবস্থিত।তবে হাইডেলবার্গ জানিয়েছে, ২০২৩ সালে হ্যানসন ইসরাইল ওই খনি এবং এর সঙ্গে থাকা অ্যাসফল্ট ও প্রস্তুত কংক্রিট কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে বর্তমানে শুধু নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন।জেরুজালেমের রেলপথে এজিস ও সিএএফফরাসি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এজিস জেরুজালেমের লাইট-রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এই রেলপথ পূর্ব জেরুজালেমের অবৈধ ইসরাইলি বসতিগুলোকে শহরের পশ্চিম অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে।জাতিসংঘ এজিসকে বসতিগুলোর অস্তিত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণে সহায়ক সেবা এবং পরিবহন অবকাঠামো দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে।এজিসের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, জেরুজালেমের লাইট-রেল প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ততা এখনো রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জেরুজালেমের লাইট-রেল প্রকল্পে কাজের জন্য প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে।যুক্তরাজ্যে এজিস নিয়ন্ত্রিত পাঁচটি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের ছয়টি সরকারি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির মোট মূল্য ১৩৩ দশমিক ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। এর প্রায় পুরো অর্থই এসেছে একটি চুক্তি থেকে। ড্রাইভার অ্যান্ড ভেহিকল লাইসেন্সিং এজেন্সি ব্রিটেনজুড়ে আইন প্রয়োগসংক্রান্ত সেবার জন্য এজিস প্রজেক্টস ইউকে লিমিটেডকে ১৩৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি দিয়েছে।স্পেনের ট্রেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএএফও জেরুজালেমের লাইট-রেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৯ সালে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরোর প্রকল্পটি ট্রান্সজেরুজালেম জে-নেটকে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ মালিক সিএএফ এবং বাকি ৫০ শতাংশের মালিক ইসরাইলি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান শাপির।সিএএফ জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় গ্রিন লাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেড লাইন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর কিছু অংশ পূর্ব জেরুজালেমের মধ্য দিয়ে যাবে। নির্মাণকাজ ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলার কথা।জাতিসংঘ সিএএফকে বসতি সম্প্রসারণে সহায়ক সরঞ্জাম ও উপকরণ সরবরাহ এবং পানি ও ভূমিসহ প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত করেছে।যুক্তরাজ্যের সরকারি খাতেও সিএএফের বড় চুক্তি রয়েছে। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস কম্বাইন্ড অথরিটি নতুন প্রজন্মের ট্রাম সরবরাহের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ৮৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি দিয়েছে। চুক্তিটি ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।ফোসুনের মালিকানাধীন আহাভাচীনা শিল্পগোষ্ঠী ফোসুন ইন্টারন্যাশনালও জাতিসংঘের তালিকায় রয়েছে। অধিকৃত ভূখণ্ডের পানি ও ভূমিসহ প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে যুক্ত করা হয়েছে।অধিকৃত পশ্চিম তীরের সঙ্গে ফোসুনের সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইসরাইলি প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান আহাভা ডেড সি ল্যাবরেটরিজ। ২০১৬ সালের এপ্রিলে ফোসুন জানায়, তারা ২৯০ মিলিয়ন শেকেলে আহাভা কিনতে সম্মত হয়েছে। পরবর্তী নথিতে দেখা যায়, আহাভার ৯৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ মালিকানা ফোসুনের।ইউরোপীয় কমিশন ২০১৮ সালে জানিয়েছিল, অধিকৃত ভূখণ্ডে অবস্থিত মিতজপে শালেম বসতিতে আহাভার কার্যক্রম রয়েছে।আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও মিতজপে শালেমের ওই কারখানা চালু ছিল। সংগঠনটির দাবি, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে মৃত সাগরের কাদা সংগ্রহ করে সেখানে প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হতো। পরে আরও উৎপাদনের জন্য তা আইন গেদিতে নেওয়া হতো।যুক্তরাজ্যে ফোসুন ইন্টারন্যাশনালের মালিকানাধীন ব্রিয়াস মেডিক্যালের দুটি সরকারি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির মোট মূল্য ১ দশমিক ২৯ মিলিয়ন পাউন্ড।আল-জাজিরা মন্তব্যের জন্য ফোসুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো জবাব পায়নি।যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে প্রশ্নআল-জাজিরার অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য যুক্তরাজ্যের ঘোষিত নীতি এবং দেশটির বাস্তব বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে অসংগতির প্রশ্ন সামনে এনেছে।২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) বলেছিলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অব্যাহত উপস্থিতি বেআইনি। ইসরাইলকে যত দ্রুত সম্ভব এই অবস্থার অবসান ঘটানোর কথাও বলা হয়। একই সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রগুলোকে ওই বেআইনি পরিস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা না করার বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করেন আদালত।তবে যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট অফিস বলেছে, কোনো সরবরাহকারীকে সরকারি চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হবে কি না, তা প্রতিটি চুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক অবরোধ বা বিধিনিষেধ না থাকলে অন্য দেশের সঙ্গে যুক্ত কোনো সরবরাহকারীকে বয়কট করার জন্য সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা ব্যবহার করা উচিত নয়।সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিন অবশ্য আল-জাজিরার অনুসন্ধানের ফলাফলকে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান ও দেশটির অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি হিসেবে দেখেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইসরাইলের দখলদারত্বের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে।