চট্টগ্রামের লালদিয়ায় আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে ডেনমার্কের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। এ প্রকল্পে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হবে। আগামী ৩ বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে পতেঙ্গায় এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব তথ্য জানান।তিনি বলেন, ‘এপি মুলারের বাংলাদেশে আসাটা একটি মাইলস্টোন। তারা লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর নির্মাণ করবে। সরকার এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।’মন্ত্রী আরও বলেন, তাঁর সংসদীয় আসনে এ টার্মিনাল নির্মাণ হচ্ছে—এতে তিনি আনন্দিত। বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার রয়েছে এবং সরকারের রয়েছে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি। তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এমপি।শেখ রবিউল আলম বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এপিএম টার্মিনাল লালদিয়ায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। এখানে আধুনিক বিভিন্ন সুবিধা থাকবে, যা দেশের জন্য সুসংবাদ।তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। বন্দরকে ঘিরে যে বাণিজ্যিক হাব গড়ে উঠেছে, তা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বন্দরে বিনিয়োগে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দেশের স্বার্থে যেসব বিনিয়োগ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব, সরকার সেগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছে।এ সময় তিনি এপিএম কনটেইনার টার্মিনাল বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতারও আশ্বাস দেন।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড। তিনি জানান, টার্মিনালটিতে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান গেটওয়ে।’ দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৯৮ শতাংশের বেশি এ বন্দরের মাধ্যমে হয়ে থাকে বলেও জানান তিনি।তিনি আরও বলেন, ডেনমার্কে গ্রিন প্রযুক্তিনির্ভর কয়েকটি টার্মিনাল পরিদর্শনের সুযোগ তাঁর হয়েছে। গত ১০ বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানানো হচ্ছে।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লেমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া।এ সময় সংসদ সদস্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।প্রকল্পে থাকবে আধুনিক সরঞ্জামচট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে ৫৯ দশমিক ১৫ একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হবে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। এর মধ্যে ৩২ একর এলাকায় মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একর এলাকায় কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর জায়গায় ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লাগবে তিন বছর। প্রাথমিকভাবে ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনে এ মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানো যাবে।বার্ষিক ৯ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকবে টার্মিনালটির। ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট ও ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। টার্মিনালটিতে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ আনা-নেওয়ার সুবিধা থাকবে।টার্মিনালে সাতটি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজি) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টর থাকবে।প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের স্থানীয় অংশীদার হিসেবে থাকবে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ প্রকল্প থেকে এককালীন ২৫ মিলিয়ন ডলার পাবে। এ ছাড়া প্রতিবছর ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার কনসেশন ফি এবং প্রতিটি কনটেইনারের জন্য ২৩ ডলার করে পাওয়ার কথা রয়েছে।প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে এপিএম টার্মিনালস ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালে লালদিয়া টার্মিনালের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে।