নিকোলাস বিশ্বাসজলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানলসহ বিভিন্ন জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। এর প্রভাব শুধু মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরই পড়ছে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামগ্রিক উন্নয়নও এর কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ নতুন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। ভবিষ্যতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বা পরিবেশগত অভিবাসীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি হতে পারে।বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতির শিকার হতে পারেন। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন।ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের (IDMC) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে। বিভিন্ন দেশে এই বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের মানবিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করছে।জলবায়ু সংকট উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জজলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেক দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি।দুর্যোগের আগে বিনিয়োগই কার্যকর সমাধানজলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।এ জন্য জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা, বন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।একই সঙ্গে এমন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া যায় এবং তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়। দুর্যোগের পর বিপুল অর্থ ব্যয় করে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার চেয়ে দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ করা অধিক কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ।দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে তাকানোর সময় এখনইজলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর অনেকটাই তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এসব প্রভাব মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের ওপর গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।তাই শুধু বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা দাবানলে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।এই সামগ্রিক চিত্রকে সামনে রেখে নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার পথ তৈরি হবে।সংকটের আড়ালে আরও গভীর সংকটজলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।তাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু দৃশ্যমান দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দিকে নজর দিলে হবে না। এর অন্তর্নিহিত কারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।কারণ কার্যকর সমাধান তখনই সম্ভব, যখন শুধু সংকটের লক্ষণ মোকাবিলা না করে এর মূল কারণ এবং মানুষের জীবন ও উন্নয়নের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। সম্মিলিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করতে।লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস, মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।