তিন মাস মানুষের আনাগোনা কম থাকায় সুন্দরবনে বন্য প্রাণীর বিচরণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বন বিভাগের দাবি, নদী ও খালে মাছের পরিমাণও বেড়েছে এবং কমেছে বন অপরাধ। বনজ সম্পদের ওপর মানুষের চাপ কম থাকায় এই সময়ে সুন্দরবন তার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।মাছ ও বন্য প্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ, মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ ও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও তিন মাস পর্যটক, জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের আনাগোনা থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিল সুন্দরবন। নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবার এসব কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে সুন্দরবনে ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে বন অপরাধের ঘটনায় ৩৯টি মামলা হয়েছে এবং ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি মাছ ধরার জাল, ২৮ বোতল ও দুই লিটার তরল বিষ এবং হরিণ শিকারের ৬ হাজার ২৯০টি ফাঁদ জব্দ করা হয়।এ ছাড়া ১৮৬ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ৭৩৬ কেজি কাঁকড়া, ১ হাজার ৫৬২টি চারু, ২ হাজার বড়শি, ১৭০ কেজি মধু এবং দুই বস্তায় থাকা ৫ কেজি শুঁটকি মাছ উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগের দাবি, গত বছরের নিষেধাজ্ঞার সময়ের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে বন অপরাধের পরিমাণ কমেছে।বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছের পরিমাণ বেড়েছে। বাঘ, হরিণসহ বন্য প্রাণী নির্বিঘ্নে বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ পেয়েছে। মানুষের চলাচল, পর্যটন ও শব্দদূষণ কম থাকায় বনের গহিন অঞ্চলে প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে।তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগ এখন আগের চেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। নিয়মিত বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি স্মার্ট প্যাট্রলিং ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। এর ফলে হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তৎপরতা কমেছে।পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন শুধু বাঘ ও হরিণের আবাসস্থল নয়; অসংখ্য উদ্ভিদ, পাখি, সরীসৃপ, উভচর ও জলজ প্রাণীরও আশ্রয়স্থল। বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে নির্দিষ্ট সময় মানুষের চাপ কমানো জরুরি। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মানবসৃষ্ট চাপ কম থাকায় সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা নিজেকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছে।তিন মাসের বিরতির পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে ফিরছেন জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকেরা। বন বিভাগ জানিয়েছে, বৈধ পাস-পারমিট দেওয়ার পাশাপাশি নৌযান চলাচল ও সুন্দরবনে প্রবেশ ব্যবস্থাপনায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের (আইআরএমপি) সুপারিশ অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ রাখা হতো। পরে ২০২২ সালে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট করা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে কর্মহীন জেলেদের খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হয়।