সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হলে মানুষের হাতে ব্যয়যোগ্য আয় বাড়বে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সেই অনুপাতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে বেতন বৃদ্ধিকে অজুহাত করে পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা।নতুন পে স্কেলের সুযোগ নিয়ে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, মজুত, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক।সভায় ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা ও ময়দাসহ নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে দাম বাড়ার সুযোগ থাকবে না। এ জন্য উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার জটিলতা দ্রুত দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বিভিন্ন মিল-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানিকারকেরা এলসি খোলার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। উৎপাদন ও আমদানি স্বাভাবিক না থাকলে সরবরাহ কমে গিয়ে বাড়তি চাহিদার বিপরীতে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।এদিকে নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা অমূলক বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, বেতন বাড়ার অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানো উচিত নয়। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বাড়লে মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বাড়বে। এর ফলে ভোগ ও পণ্যের চাহিদায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। নতুন পে স্কেলের সরাসরি প্রভাব খুব বড় না হলেও এর পরোক্ষ প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।সভায় উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর পথে অপ্রয়োজনীয় হাতবদল কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা বলেন, সরবরাহব্যবস্থায় যত বেশি স্তর থাকবে, পণ্যের সঙ্গে তত বেশি অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হবে। তাই সরবরাহব্যবস্থাকে আরও সংক্ষিপ্ত, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।এ ছাড়া মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য তদারকি জোরদার, অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের নজরদারির আওতায় আনা এবং সরবরাহব্যবস্থায় হয়রানি বন্ধের দাবি জানানো হয়। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেন ব্যবসায়ী নেতারা।সভায় টিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি পরিবারের কাছে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করছে। সরকারি এসব কার্যক্রম বাজারে চাহিদা ও দামের ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেলের ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ, জ্বালানি পরিস্থিতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। তাই বেতন বৃদ্ধিকে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত না বানিয়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কার্যকর বাজার নজরদারি জোরদার করাকেই নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি সহজীকরণ, শুল্ক-কর যৌক্তিকীকরণ ও বিকল্প উৎসের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।