বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই পূরণ করতে হয় আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল পরিশোধনের মাধ্যমে। এতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। অথচ দেশে উৎপাদিত ধানের কুঁড়া থেকে বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো না যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে না।বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেল প্রয়োজন হয়। এর বড় অংশই আসে আমদানি করা সয়াবিন ও পাম তেল থেকে। রাইস ব্র্যানসহ দেশীয় উৎসের তেলের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম।খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও স্থানীয় বাজারে এর সরবরাহ সীমিত। ফলে একদিকে কারখানাগুলোর বড় অংশের উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তার কাছেও পণ্যটি সহজলভ্য হচ্ছে না।বাড়ছে ভোজ্যতেল গ্রহণ, বাড়ছে আমদানিওবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে মাথাপিছু ভোজ্যতেল গ্রহণের হার ছিল দিনে প্রায় ৩১ গ্রাম। ২০১৬ সালে এ হার ছিল প্রায় ২৭ গ্রাম। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে দেশে ভোজ্যতেলের ব্যবহারও বাড়ছে।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ২২ লাখ ২৩ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। শুল্ক ও ভ্যাটসহ মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা।রাইস ব্র্যান অয়েলের বড় সম্ভাবনাধানের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত রাইস ব্র্যান অয়েলকে বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর ভোজ্যতেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে স্যাচুরেটেড, মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ভারসাম্য রয়েছে। এতে ট্রান্সফ্যাট না থাকা এবং ভিটামিন-ই কমপ্লেক্স, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও গামা-ওরিজানল থাকায় হৃদস্বাস্থ্যের জন্য এর সম্ভাব্য উপকারিতার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) তথ্যমতে, অলিভ অয়েলের পরই রাইস ব্র্যান অয়েলের পুষ্টিগুণ উল্লেখযোগ্য। নিউইয়র্কের রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও ক্যানসার প্রতিরোধ ও মেদ নিয়ন্ত্রণে এ তেলের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।অ্যালার্জিমুক্ত ও হালকা স্বাদের এ তেলে রান্নার সময় অন্যান্য তেলের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম শোষণ হয়, ফলে খাবারে ক্যালরির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।সরকারি ক্রয়ে বাড়ছে চাহিদাসরকারি পর্যায়েও রাইস ব্র্যান অয়েলের চাহিদা বাড়ছে। চলতি বছর সরকার ও টিসিবির জন্য একাধিক দফায় এ তেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।মে মাসে সরকারি ক্রয় কমিটি এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার অনুমোদন দেয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর আগে মার্চেও আরও বড় পরিমাণ রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এক কোটি ৮০ লাখ লিটার রাইস ব্র্যান অয়েল সংগ্রহের সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্যও আসে। সরকারি পর্যায়ে এ ধরনের ক্রয় পণ্যটির একটি নিশ্চিত বাজারের ইঙ্গিত দিলেও সাধারণ ভোক্তার বাজারে স্থায়ী চাহিদা তৈরি না হওয়ায় উৎপাদকরা বড় পরিসরে উৎপাদনে ঝুঁকি নিতে পারছেন না।সয়াবিন তেলের মান নিয়ে প্রশ্নদেশের রান্নাঘরে সয়াবিন তেল এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের রান্না—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।বাজারে প্রচলিত প্যাকেটজাত সয়াবিন তেলের বড় অংশই ডাবল রিফাইনড বা ফর্টিফাইড। এসব তেল অতিরিক্ত পরিশোধনের কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বচ্ছ ও পাতলা হয়ে থাকে। তবে তেলের মান, পরিশোধন প্রক্রিয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের এক গবেষণায় বাজারের বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।গবেষণা দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহিন (এলপিআর) বলেন, গবেষণায় দেশের বাজারে পাওয়া সয়াবিন তেলের মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার ভোজ্যতেলে ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করেছে। উৎপাদন পর্যায়ে নজরদারি ও তদারকি জোরদার করা গেলে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে খাদ্যদ্রব্যে ‘ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা’ প্রণয়ন করে। এটি ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। প্রবিধান অনুযায়ী খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা দুই শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় সয়াবিন তেলের কিছু নমুনায় এ সীমার চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে।এ ছাড়া সয়াবিন তেল পরিশোধনের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁয় একই তেল বারবার গরম করে ব্যবহারের কারণে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।হৃদরোগের ঝুঁকিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রান্সফ্যাট রক্তে উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরল কমিয়ে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়ায়। এতে রক্তনালিতে চর্বি জমে কার্ডিওভাসকুলার জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।বিবিএসের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতিবছর দুই লাখ পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ হৃদরোগে মারা যান। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৫৬২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগে।গবেষকদের মতে, সয়াবিন তেল পরিশোধন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং একই তেল বারবার ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি ভোজ্যতেলে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ও বাজার পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগদেশের ভোজ্যতেলের বাজারে আমদানির পরিমাণ কমাতে রাইস ব্র্যান অয়েল গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। এর প্রধান কাঁচামাল ধানের উপজাত হওয়ায় দেশে উৎপাদিত এ কাঁচামাল ব্যবহার করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি চালকল, কৃষক ও স্থানীয় শিল্পে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রথমে ধানের কুঁড়া সংগ্রহের কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কারখানার সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ছোট প্যাকেজে সরবরাহ বাড়ানো এবং খুচরা বাজারে পণ্যটির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোক্তার আস্থা তৈরি করা। রাইস ব্র্যান অয়েলের স্বাস্থ্যগত দিক তুলে ধরার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও যাচাইযোগ্য তথ্য ভোক্তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে। কোনো তেলকে অযথা ‘সবচেয়ে ভালো’ কিংবা অন্য কোনো তেলকে ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে উপস্থাপন না করে পুষ্টিগুণ, মান ও নিরাপদ ব্যবহারের তথ্য স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।কারণ, দেশের কোটি মানুষের রান্নার তেলের প্রশ্নটি শুধু একটি শিল্পের বাজার তৈরির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাদ্যনিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি উপজাতের ব্যবহার এবং সর্বোপরি ভোক্তার স্বাস্থ্য ও আস্থা।