অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহমাঝেমধ্যে বুকজ্বালা বা হার্টবার্নের সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। সাধারণত বুক বা পাকস্থলীতে অস্বস্তিকর জ্বালাপোড়া থেকে এর শুরু হয়, যা কখনো গলা পর্যন্ত উঠে আসে। অতিরিক্ত ঝাল খাবার কিংবা অ্যালকোহল গ্রহণের পর এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাঝে মধ্যে বুকজ্বালা হওয়া সাধারণত গুরুতর বিষয় নয়। তবে নিয়মিত বা ঘন ঘন বুকজ্বালা হলে তা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের লক্ষণ হতে পারে।অ্যাসিড রিফ্লাক্সের অন্যতম প্রধান উপসর্গ হলো বুকের ভেতর জ্বালাপোড়া বা ব্যথা, যা ধীরে ধীরে গলার দিকে উঠে আসে। খাবার বা তরল মুখের দিকে উঠে আসার অনুভূতি, গলার পেছনে টক বা তিক্ত স্বাদ এবং ঝুঁকে বসলে বা শুয়ে পড়লে—বিশেষ করে রাতে—ব্যথা বা জ্বালাপোড়া বেড়ে যাওয়াও এর সাধারণ লক্ষণ।ধূমপান, অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা এ সমস্যা বাড়াতে পারে। মানসিক চাপ ও উদ্বেগও অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের উপসর্গ তীব্র করে।যেসব খাবারে বুকজ্বালা বাড়তে পারেব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন খাবার বুকজ্বালা বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত এ সমস্যায় ভুগলে নিজের ক্ষেত্রে কোন খাবার বা পানীয় উপসর্গ বাড়াচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সেগুলো সীমিত করা গুরুত্বপূর্ণ।চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার: খাসি বা গরুর মাংস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা এবং অতিরিক্ত তেল-ঘিয়ে রান্না করা খাবার পাকস্থলীতে দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। এগুলো হজমে বেশি সময় নেওয়ায় পাকস্থলীর ওপর চাপ তৈরি হয়ে অ্যাসিড ওপরে উঠে আসতে পারে।ঝাল ও মসলাদার খাবার: অতিরিক্ত মরিচ, গরম মসলা, কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন অনেকের বুকজ্বালার উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।টকজাতীয় ফল ও টমেটো: লেবু, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, তেঁতুল এবং টমেটো বা টমেটো সস-কেচাপও কিছু মানুষের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের উপসর্গ বাড়াতে পারে।চকোলেট: চকোলেটে থাকা ক্যাফেইন, থিওব্রোমিন ও চর্বি খাদ্যনালির নিচের পেশি বা লোয়ার ইসোফেজিয়াল স্পিংক্টার (এলইএস) শিথিল করতে পারে। এতে পাকস্থলীর অ্যাসিড ওপরে উঠে আসার প্রবণতা বাড়তে পারে।চা-কফি ও ক্যাফেইন: গাঢ় চা, কফি ও এনার্জি ড্রিংকসে থাকা ক্যাফেইন অনেকের ক্ষেত্রে বুকজ্বালা বাড়াতে পারে।কার্বোনেটেড পানীয়: সোডা ও কোমলপানীয়ের গ্যাস পাকস্থলীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে অ্যাসিড ওপরের দিকে উঠে আসার প্রবণতা বাড়তে পারে।পুদিনা: সাধারণ ধারণায় পুদিনা পাকস্থলী ঠান্ডা করলেও এটি খাদ্যনালির নিচের পেশি শিথিল করতে পারে। ফলে রিফ্লাক্সের প্রবণতা থাকলে সমস্যা বাড়তে পারে।প্রসেসড ও ফাস্টফুড: প্রসেসড মিট, পিৎজা, বার্গার ও প্যাকেটজাত স্ন্যাকসে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং বুকজ্বালার উপসর্গ বাড়াতে পারে।অ্যাসিড রিফ্লাক্স এড়াতে যা করবেনবুকজ্বালা নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য—১. একসঙ্গে পেট ভরে না খেয়ে অল্প অল্প করে দিনে ৫ থেকে ৬ বার খাবার খেতে পারেন।২. রাতে খাবার পরপরই শুয়ে পড়বেন না। খাবারের অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর ঘুমাতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।৩. খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত পানি না খেয়ে খাবারের আধা ঘণ্টা আগে বা পরে পানি পান করার অভ্যাস করতে পারেন।৪. কোন নির্দিষ্ট খাবার খেলে আপনার বুকজ্বালা বাড়ছে, তা লক্ষ্য করে নোট রাখুন এবং প্রয়োজন হলে খাদ্যতালিকা থেকে সেটি বাদ দিন।মাঝেমধ্যে বুকজ্বালা হলে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে উপসর্গ নিয়মিত হলে বা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরও না কমলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।লেখক: বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজিসাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, ঢাকা