ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার জেরে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের হামলায় ৭৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও সাময়িকভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রিয়াদ।২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত শুরু হয়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরু হলেও দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়।সাম্প্রতিক সময়ে সেই উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। হুথিদের দাবি, গত তিন দিনে সৌদি আরব ইয়েমেনে ১২১টি বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি সরকার এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ইয়েমেন সরকার হুথিদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কয়েকটি বিমান হামলার দায় স্বীকার করেছে।সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেছেন, কূটনীতির পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং সৌদি আরব শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তবে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রিয়াদ দ্বিধা করবে না।মঙ্গলবার হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিকমাধ্যমে দাবি করেন, সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো ছিল পাল্টা পদক্ষেপ। তাঁর অভিযোগ, গত তিন দিনে সৌদি আরব ইয়েমেনে ১২১টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলায় একটি কারাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বন্দিরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, ইয়েমেন ‘আবারও বড় আকারের যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে’। তাঁর মতে, উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। হুথিরা এমন কয়েকটি এলাকা দখলের চেষ্টা চালায়, যেগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে লোহিত সাগরের নৌপথে তাদের প্রভাব আরও বাড়তে পারত।হুথিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে আসছিল সৌদি আরব। তবে চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমির মতে, এখন আর সেই সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া সৌদি আরবের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যুদ্ধে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততা আরও ত্বরান্বিত করবে।এদিকে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ ও তেল রপ্তানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও বেড়ে যেতে পারে। সর্বশেষ হামলার পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারে উঠেছে।তবে সৌদি আরব নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ালেও হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, রিয়াদ বরং হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানকে নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটালেও হুথিদের ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। ফলে এবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া সৌদি আরবের জন্য উচ্চঝুঁকির সিদ্ধান্ত হতে পারে।