একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলে পরিচিত প্রাণী ছিল খেঁকশিয়াল। এখন সেই অতিপরিচিত বন্যপ্রাণীটিকেই আগের মতো আর দেখা যায় না। ক্রমেই কমছে এর সংখ্যা। পরিবেশবিদদের মতে, খেঁকশিয়ালের এই হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি প্রাণীর অস্তিত্ব সংকট নয়; এটি দেশের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্যও সতর্কবার্তা।প্রকৃতিতে খেঁকশিয়ালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মৃত প্রাণী খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, ইঁদুরসহ ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই বন্যপ্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে খেঁকশিয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়াকে পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।খেঁকশিয়াল নিয়ে ভুল ধারণাজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, খেঁকশিয়াল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে অনেকেই খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালকে একই প্রাণী মনে করেন। এ বিভ্রান্তির কারণে খেঁকশিয়ালকে ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।তার ভাষ্য, কৃষকদের মধ্যে ধারণা রয়েছে খেঁকশিয়াল মুরগি খেয়ে ফেলে। তবে তাদের গবেষণায় এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অত্যন্ত বিরলভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কাছে এ ধরনের কোনো রেকর্ড নেই।মূলত খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়াল—দুটিই সর্বভুক প্রাণী। তবে পাতিশিয়াল আকারে তুলনামূলক বড় হওয়ায় বড় শিকার ধরতে পারে। গৃহপালিত হাঁস-মুরগির ওপর আক্রমণের অভিযোগও বেশি শোনা যায় পাতিশিয়ালের বিরুদ্ধে।অন্যদিকে খেঁকশিয়ালের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে ইঁদুর, পোকামাকড়, ছোট সরীসৃপ, ফল ও মৃত প্রাণী।‘খেঁকশিয়াল কৃষকের বন্ধু’অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, পঞ্চগড়, রাজশাহী, দিনাজপুর, মাগুরা ও কুষ্টিয়ায় তারা গবেষণা করেছেন। এসব গবেষণায় খেঁকশিয়াল কৃষকের মুরগি খেয়ে ফেলার কোনো তথ্য তারা পাননি।তিনি বলেন, মুরগি খায় পাতিশিয়াল। খেঁকশিয়াল মূলত পোকামাকড় খায়, পাশাপাশি কিছু ফসলও খায়। শিয়ালের বিষ্ঠা পরীক্ষা করেও তারা এ ধরনের খাদ্যাভ্যাসের প্রমাণ পেয়েছেন।অধ্যাপক আজিজের মতে, শিয়াল ক্ষতিকর প্রাণী নয়; বরং পরিবেশ ও কৃষির জন্য উপকারী। বিশেষ করে ইঁদুর ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখায় খেঁকশিয়ালকে কৃষকের বন্ধু বলা যায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণীটি বাংলাদেশ থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।আবাসস্থল সংকটেই কমছে সংখ্যাআইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম বলেন, খেঁকশিয়াল নিভৃতচারী প্রাণী। সাধারণত মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে এবং পরিবারকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখন তাদের নিরিবিলি থাকার মতো জায়গা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।তার মতে, আগে বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গল ও ঘাসবন ছিল। খেঁকশিয়াল গভীর বনের প্রাণী নয়; পদ্মার বিভিন্ন চরাঞ্চলের ঘাসবনেও তারা বসবাস করতে পারে। কিন্তু মানুষের চাপ বেড়ে যাওয়ায় এসব আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। ফলে থাকার জায়গার সংকট তৈরি হয়ে খেঁকশিয়ালের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীবাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইন অনুযায়ী শিয়াল সংরক্ষিত বন্য প্রাণী। শিয়াল হত্যা, এর মাংস খাওয়া কিংবা বিক্রি করা দণ্ডনীয় বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।বিশেষজ্ঞদের মতে, খেঁকশিয়াল সংরক্ষণ শুধু একটি বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয় নয়। পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য, কৃষিতে ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখার জন্যও এর অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবাসস্থল রক্ষা ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই প্রাণীটিকে সংরক্ষণ করা জরুরি।