নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা। চালু হচ্ছে মোবাইল ও প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতাও।নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন নিট পেনশন ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন ও নিট পেনশন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তুতি চলছে। অর্থ বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে এবং শিগগিরই প্রজ্ঞাপনের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।যেসব সুবিধা বাড়ছে১. বাড়িভাড়া ভাতাএলাকাভেদে বাড়িভাড়া ভাতার হার বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ, অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার পৌরসভায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় গ্রেডভেদে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।২. বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতাগ্রেড নির্বিশেষে বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছর একদিন থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ বছর একদিন থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।৩. নিম্ন গ্রেডে বেশি বেতন বৃদ্ধিবার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে। গ্রেড-৬ ও তদনিম্ন গ্রেডে ৫ শতাংশ, গ্রেড-৩ ও ৪-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।৪. মোবাইল ভাতানতুন পে স্কেলে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতার আওতায় আসছেন। গ্রেড-৫ ও এর ঊর্ধ্বের জন্য ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-৬ ও এর নিচের গ্রেডের জন্য ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।৫. যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতাযাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে।৬. প্রতিবন্ধী সন্তানের ভাতাসরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের জন্য নতুন করে ৩ হাজার টাকা ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সর্বোচ্চ দুজন সন্তান এ সুবিধা পাবেন।৭. ঝুঁকি ও প্রেষণ ভাতাপ্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা সহায়ক, কার্যভার, আপ্যায়ন ও উৎসব ভাতা বিদ্যমান হারেই বহাল থাকবে।৮. পাহাড়ি, হাওড়, দ্বীপ ও চর ভাতাপাহাড়ি এলাকায় মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পার্বত্য জেলা সদর ও সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হাওড়, দ্বীপ ও চর এলাকায়ও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা বহাল রেখে সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।৯. পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নিট পেনশনের সর্বনিম্ন সীমা ১০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।১০. সামরিক বাহিনীর ভাতাসশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ অধিকাংশ ভাতার বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।ব্যয় বাড়বে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশিনতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। চলতি অর্থবছরে মূল বেতন ও নিট পেনশন বাবদ প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের চেয়ে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা বেশি। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে মূল বেতন ও নিট পেনশন বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকার সামর্থ্যের মধ্যে থেকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা ইতিবাচক। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিন ধাপে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও যৌক্তিক বলে তিনি মনে করেন।