এডিপি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার মধ্যেই প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার দুটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মা-শিশু ও অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে প্রকল্প দুটিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৪৩৫ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা।আজ বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় সভায় স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের মোট ১৫টি প্রকল্প উপস্থাপনের কথা রয়েছে।এডিপি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য খাত পিছিয়েআইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এডিপি বরাদ্দের মাত্র ৩১ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে।একই অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত এডিপির বিপরীতে মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা এডিপি বাস্তবায়নের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এ অবস্থায় বড় অঙ্কের নতুন প্রকল্প নেওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।অন্যদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে।টিবি, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়ায় ৪০৩৯ কোটিপ্রস্তাবিত প্রকল্প দুটির মধ্যে ‘ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম রেসপন্স টু ফাইট এগেইনস্ট টিবি, এইচআইভি/এইডস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে প্রায় ৩ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। দ্য গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস, টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া থেকে অনুদান হিসেবে আসবে প্রায় ৮৭০ কোটি টাকা।প্রকল্পের বড় অংশ ব্যয় হবে চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ ও টিকা সংগ্রহে। চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল সামগ্রী কিনতে ১ হাজার ৪৩০ কোটি ৪৬ লাখ এবং ওষুধ ও টিকা সংগ্রহে ৯৫৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। পুষ্টি সহায়তায় ৪১৬ কোটি, স্থানীয় প্রশিক্ষণে ৭০ কোটি এবং জরিপে ১৪৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে প্রতিরোধমূলক যক্ষ্মা চিকিৎসা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে ২৩টি অগ্রাধিকার জেলায় চলমান কার্যক্রম ৬৪ জেলার হাসপাতাল পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সম্ভাব্য এইচআইভি আক্রান্তদের ৮৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।ম্যালেরিয়ায় পার্বত্য এলাকায় বিশেষ নজরম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণেও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের। এর মধ্যে বান্দরবানে ৪১ শতাংশ এবং রাঙামাটিতে ৩৬ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছিল।২০২৯ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি হাজারে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের হার একের নিচে নামিয়ে আনা এবং ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির পর্যালোচনায় বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কিছু দুর্বলতাও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, আগে কেনা চিকিৎসা সরঞ্জামের মাত্র ২০ শতাংশ সচল রয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি কেনার আগে বিদ্যমান সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।একই সঙ্গে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত এবং সঠিক ব্যবহারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বৈদেশিক অনুদান শেষ হওয়ার পর কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বাস্তবসম্মত ‘এক্সিট প্ল্যান’ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩৯৭ কোটি টাকার প্রকল্পঅন্য প্রকল্প ‘হেলথ সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং থ্রু এমএনসিএইচ সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এনসিডি কন্ট্রোল’-এ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৮ মেয়াদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রাস্ট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।এতে সরকারের অর্থায়ন ৭৫ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং জাইকার ঋণ ৩২১ কোটি ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা।প্রকল্পের আওতায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩০টি জেলা হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। মা, নবজাতক ও শিশুর চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা ও ফলোআপের ব্যবস্থা করা হবে।কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চতর স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর রেফারেল ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যয়প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়। হৃদরোগে মৃত্যু ঘটে প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উচ্চ রক্তচাপের হার ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।এ কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে এসব রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।প্রকল্পে চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল সামগ্রী কিনতে ১৪৩ কোটি ২১ লাখ, স্থানীয় প্রশিক্ষণে ১০৪ কোটি ৩৭ লাখ এবং কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় ৮ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার এবং বিদেশি প্রশিক্ষণে ৩ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।