সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করতে নতুন বেশ কিছু সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়া, স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা, বিশেষ প্রয়োজনে ঋণের সুযোগ এবং নির্দিষ্ট শর্তে পেনশন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে পুরো অর্থ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রস্তাবগুলো অনুমোদন এবং বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন সুবিধাগুলো চালু করা হতে পারে।প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনিবয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টেকসই সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে নির্ভরশীলতার হার বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করে সরকার। তবে প্রায় তিন বছর পরও এতে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের আমানতের সুদের তুলনায় পেনশন ব্যবস্থায় রিটার্ন কম এবং গ্রাহকদের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা সীমিত হওয়ায় মানুষের আগ্রহ কম।বর্তমানে চারটি স্কিমে মোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের জমার পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য চালু ‘সমতা’ স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রবাসীদের জন্য চালু ‘প্রবাস’ স্কিমে অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী এতে নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ৯৭ জন। এ স্কিমে জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।স্বামী বা স্ত্রী পাবেন আজীবন পেনশনবর্তমান নিয়মে পেনশনার ৬০ বছর বয়সে মাসিক পেনশন পাওয়া শুরু করেন। পেনশন পাওয়ার সময় তাঁর মৃত্যু হলে নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত একই হারে মাসিক পেনশন পান।নতুন প্রস্তাবে নমিনির পরিবর্তে পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ প্রস্তাব করা হয়েছে।চালু হতে পারে ঋণ সুবিধাসর্বজনীন পেনশন আইনে গ্রাহকের জমা করা অর্থের একটি অংশ বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এতদিন এ সুবিধা চালু হয়নি। এবার তা চালুর পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ।প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট প্রয়োজনে গ্রাহক তাঁর জমা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন। ঋণের বিপরীতে যে সুদ পাওয়া যাবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পেনশন হিসাবে জমা হওয়ার কথা রয়েছে।অক্ষম হলে পুরো অর্থ তোলার সুযোগপেনশন ব্যবস্থায় পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর কেউ শারীরিক ও আর্থিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে বিশেষ বিবেচনায় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে পুরো অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ সুবিধা চালু হলে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে।মাসে ১০ থেকে ২০ টাকায় স্বাস্থ্যবিমাপেনশনারদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ১০ থেকে ২০ টাকা প্রিমিয়াম নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে পেনশনারদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।বিবেচনায় শরিয়াহভিত্তিক স্কিমধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার।জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পেলে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন সুবিধাগুলো চালু হলে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।