পুদিনা শুধু খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়ানোর উপকরণ নয়, হজমের অস্বস্তি, মুখের সতেজতা এবং শারীরিক শিথিলতার ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য উপকারিতা রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই বদহজমসহ বিভিন্ন হজমজনিত সমস্যায় পুদিনা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এতে থাকা মেন্থল ও অন্যান্য জৈবসক্রিয় উপাদান নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাও হয়েছে।পুদিনায় অল্প পরিমাণে পলিফেনলের মতো উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে পুদিনাকে প্রধান পুষ্টির উৎস হিসেবে না দেখে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।পুদিনায় রয়েছে যেসব পুষ্টি উপাদানপুদিনায় ভিটামিন এ ও সি ছাড়াও অল্প পরিমাণে ফোলেট (ভিটামিন বি৯) এবং ভিটামিন বি৬ রয়েছে। এসব উপাদান চোখের স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া, মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও কোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় ভূমিকা রাখে।প্রায় ১১ দশমিক ৪ গ্রাম তাজা স্পিয়ারমিন্ট, অর্থাৎ প্রায় দুই টেবিল চামচ পুদিনা থেকে দৈনিক প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ-এর প্রায় ৩ শতাংশ এবং প্রায় ১৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এ ছাড়া এতে রোজম্যারিনিক অ্যাসিডের মতো ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট এবং আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ রয়েছে।তবে এসব পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। তাই পুদিনাকে নিয়মিত সুষম খাবারের সঙ্গে যুক্ত করলে স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত পুষ্টিগুণ পাওয়া যেতে পারে।পেপারমিন্ট ও স্পিয়ারমিন্টে পার্থক্যপুদিনার রয়েছে শত শত জাত। এর মধ্যে পেপারমিন্ট ও স্পিয়ারমিন্ট সবচেয়ে পরিচিত। পেপারমিন্টের স্বাদ তুলনামূলকভাবে তীব্র ও ঝাঁজালো। এতে মেন্থলের পরিমাণ বেশি থাকায় মুখে শীতল অনুভূতি তৈরি হয়। এ কারণে টুথপেস্ট, চুইংগাম, বদহজমের কিছু ওষুধ ও বিভিন্ন পানীয়তে পেপারমিন্টের ব্যবহার বেশি।অন্যদিকে স্পিয়ারমিন্টের স্বাদ তুলনামূলকভাবে মৃদু ও কিছুটা মিষ্টি। সালাদ, সস, বিভিন্ন পানীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের খাবারে এর ব্যবহার বেশি।হজমে কীভাবে সহায়তা করতে পারেভারী খাবারের পর পুদিনা চা পান করার প্রচলন দীর্ঘদিনের। পেটের অস্বস্তি ও বদহজম কমাতেও অনেকে পুদিনা ব্যবহার করেন।পুদিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মেন্থল। এটি পরিপাকতন্ত্রের পেশি কিছুটা শিথিল করতে পারে। পাশাপাশি প্রদাহসৃষ্টিকারী কিছু রাসায়নিক উপাদানের কার্যক্রম কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে পেটের মোচড়, ব্যথা ও পেট ফাঁপার মতো কিছু উপসর্গ প্রশমিত হতে পারে।মানসিক চাপেও সম্ভাব্য ভূমিকাপুদিনার সম্ভাব্য উপকারিতা শুধু হজমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক চাপ ও উদ্বেগের ক্ষেত্রেও পুদিনার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।পুদিনায় থাকা মেন্থল এক ধরনের টারপিন। বিভিন্ন উদ্ভিদের স্বতন্ত্র গন্ধ ও স্বাদের জন্য এ ধরনের যৌগ গুরুত্বপূর্ণ। পুদিনার মেন্থলযুক্ত সুগন্ধ শিথিলতার অনুভূতি তৈরি করতে এবং পেশির টান ও শারীরিক অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে পেপারমিন্ট অয়েল অ্যারোমাথেরাপিতেও ব্যবহৃত হয়।মুখের স্বাস্থ্যেও পুদিনার ব্যবহারমুখের দুর্গন্ধ দূর করতে পুদিনার ব্যবহার দীর্ঘদিনের। টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ ও বিভিন্ন মুখসতেজকারী পণ্যে পুদিনা ব্যবহারের অন্যতম কারণ এর শীতল ও সতেজ অনুভূতি।পুদিনার কিছু প্রাকৃতিক উপাদান মুখের অণুজীবের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পেপারমিন্ট, জাপানি মিন্ট, বার্গামট মিন্ট ও স্পিয়ারমিন্টের অ্যাসেনশিয়াল অয়েল দিয়ে তৈরি ‘সুপারমিন্ট’ মিশ্রণ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এতে মুখের দুর্গন্ধ ও মাড়ির রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যাকটেরিয়া কমানোর সম্ভাবনা দেখা যায়। একই সঙ্গে মুখের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও উঠে আসে।তাজা পুদিনা পাতা চিবিয়ে খেলে লালা নিঃসরণ বাড়তে পারে। এতে মুখ পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করতে পারে পুদিনার প্রাকৃতিক উপাদান। বাড়তি চিনি না থাকায় চিনিযুক্ত মিন্ট বা মিষ্টির তুলনায় তাজা পুদিনা ভিন্ন একটি বিকল্প হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি মুখের এমন কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়াতে পারে, যা দাঁতের ক্ষয় ও মুখের দুর্গন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত।লেখক: ডা. নুসরাত শোয়াইব, সহযোগী অধ্যাপক, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।