জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এ মূল্যবৃদ্ধির পর ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এক লিটার পেট্রোলের জন্য দেওয়া ১৬০ টাকার মধ্যে সরকারের কর ও শুল্ক বাবদ কত টাকা যাচ্ছে?তবে পাম্পে দেওয়া খুচরা মূল্যের একটি নির্দিষ্ট অংশকে সরাসরি ‘ট্যাক্স’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। জ্বালানি আমদানির পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর আরোপ করা হয়। আমদানি মূল্য, করযোগ্য মূল্য, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণনসহ বিভিন্ন ব্যয় ও মূল্য নির্ধারণের উপাদান মিলেই শেষ পর্যন্ত খুচরা দাম নির্ধারিত হয়।জ্বালানি থেকে সরকারের বড় রাজস্বজাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু ডিজেল আমদানি থেকেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ও কর দিয়েছে।সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর বর্তমানে মোট শুল্ক ও করের হার প্রায় ২৫ থেকে ২৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রে এ হার সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।সম্প্রতি জ্বালানি আমদানিতে কর নির্ধারণের পদ্ধতি ‘ট্যারিফ ভ্যালু’ থেকে ‘ইনভয়েস ভ্যালুতে’ পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে করের পরিমাণও বাড়ে।প্রতি লিটারে কর কত?প্রথম আলোর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের নতুন মূল্য সমন্বয়ের পর প্রতি লিটার ডিজেলে শুল্ক ও কর বাবদ প্রায় ৩১ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে ৩৩ টাকা, অকটেনে প্রায় ২২ টাকা ৭৮ পয়সা, পেট্রোলে ২২ টাকা ৫ পয়সা এবং কেরোসিনে ২১ টাকা ৭৯ পয়সা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।তবে পেট্রোলের খুচরা মূল্য ১৬০ টাকা হওয়ায় এর ২২ টাকা ৫ পয়সাকেই সরাসরি ‘১৬০ টাকার কর’ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। কারণ এসব কর আমদানি পর্যায়ের মূল্য ও নির্ধারিত কর কাঠামোর ভিত্তিতে হিসাব করা হয়।কেন বাড়ল জ্বালানির দাম?সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ও জাহাজ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এতে বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে বিপিসির ঘাটতি ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচার ঠেকানোর বিষয়টিও মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।২০ টাকা বাড়ায় বাড়বে অন্যান্য খরচওপেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের সরাসরি অতিরিক্ত ব্যয় হবে। কোনো ব্যক্তি মাসে ৫০ লিটার পেট্রোল ব্যবহার করলে নতুন দামে তার মাসিক জ্বালানি ব্যয় বাড়বে ১ হাজার টাকা।তবে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে উৎপাদনস্থল থেকে বাজার পর্যন্ত সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।অর্থনীতিবিদরা জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।তাহলে ১৬০ টাকার পেট্রোলে কর কত?এক লিটার পেট্রোলের ১৬০ টাকা থেকে নির্দিষ্ট একটি অঙ্ককে আলাদা করে ‘প্রতি লিটারের ট্যাক্স’ বলা নির্ভুল হবে না। পেট্রোলের সুনির্দিষ্ট আমদানি মূল্য, করযোগ্য মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব ছাড়া খুচরা মূল্যের মধ্যে করের প্রকৃত অংশ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।অর্থাৎ পাম্পে এক লিটার পেট্রোলের জন্য ১৬০ টাকা দিলেও এ অর্থের পুরোটা জ্বালানির মূল দাম নয়। এর মধ্যে আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন এবং জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান রয়েছে।তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রয়টার্স, প্রথম আলো ও সমকাল।