জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) প্রতিষ্ঠার পর পেরিয়ে গেছে ২০ বছর। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছে মাত্র একটি ক্যাফেটেরিয়া। এর আসনসংখ্যা মাত্র ৬০। বেশ কিছু আসন আবার ভাঙাচোরা।পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিস্তর অভিযোগ খাবারের দাম ও মান নিয়েও। নিম্নমানের খাবার অথচ দাম বেশি—এ কারণে ভোগান্তিতে পড়েন তারা। ফলে কম খরচে খাবারের জন্য ক্যাফেটেরিয়ার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনই বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য একটি আসন১৮ হাজার শিক্ষার্থীর এই ক্যাফেটেরিয়ায় আসন রয়েছে মাত্র ৬০টি। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে একটি আসন। এর মধ্যে কিছু চেয়ার-টেবিল নষ্ট থাকায় ব্যবহারযোগ্য আসন সংখ্যা আরো কম।দুপুরের ব্যস্ত সময় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। টোকেন নেওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীকে বসার জায়গার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কেউ দাঁড়িয়ে খাবার খান আবার কেউ খাবার নিয়ে ক্যাম্পাসের অন্য কোনো ফাঁকা জায়গায় চলে যান।শিক্ষার্থীদের মতে, ক্লাসের ফাঁকে দ্রুত খাবার শেষ করে পরের ক্লাসে যেতে হয়। কিন্তু বসার জায়গা না থাকায় খাবার হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে খাবার খাওয়ার সময়টুকুও অনেকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।খাবারে পোকামাকড় ও তেলাপোকাক্যাফেটেরিয়ার স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খাবারে পোকামাকড় ও তেলাপোকা পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিভিন্ন সময় খাবারের মধ্যে এ ধরনের পোকামাকড় পাওয়া গেছে। এতে খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।শিক্ষার্থীদের দাবি, খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি রান্নার পুরো প্রক্রিয়ায়ই স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।মান নিয়ে অসন্তোষশিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ক্যাফেটেরিয়ায় তেহারি ৪০ টাকা, ভাতের সঙ্গে এক পিস মুরগি অথবা ছোট মাছ ও পাতলা ডাল ৪০ টাকা, খিচুড়ি ও ছোট ডিম ৪০ টাকা, ছোট পরোটা পাঁচ টাকা এবং ছোট শিঙাড়া চার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে কম দাম হলেও খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীদের অনেকে।তাদের ভাষ্য, স্বল্পমূল্যে খাবার সরবরাহ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে কম দামের অজুহাতে খাবারের মান, পরিমাণ ও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা উচিত নয়।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়মিত সীমিত কয়েক ধরনের খাবার পাওয়া যায়। ফলে প্রতিদিন একই ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের প্রত্যাশা, স্বল্পমূল্যের মধ্যে কয়েক ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রাখা হলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার বেছে নিতে পারবেন।এছাড়া রান্নাঘরের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না ও খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে। রান্নার স্থান, খাবার সংরক্ষণ ও পরিবেশনের জায়গায় যথাযথ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তাদের মতে, খাবারে পোকামাকড় বা তেলাপোকা পাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে রান্নাঘরের পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। রান্নাঘরসহ পুরো ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।‘ফাও’ খাওয়ার অভিযোগক্যাফেটেরিয়ার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থী সাইমা মিমের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কেউ কেউ নিয়মিত বিনামূল্যে বা ‘ফাও’ খাবার খান। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।শিক্ষার্থীদের দাবি, টোকেন বিক্রি, খাবারের আয়-ব্যয় এবং বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ হিসাব রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত হিসাব প্রকাশ ও তদারকি থাকলে এ ধরনের অভিযোগের সুযোগ কমবে বলে তারা মনে করেন।ভর্তুকির দাবি জকসুরএদিকে, ক্যাফেটেরিয়ার খাবারে ভর্তুকির দাবি তুলেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু)। গত ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তিন লাখ টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব দিয়ে লিখিত আবেদন করে জকসু। সেখানে চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যে ভর্তুকির পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বলেন, ক্যাফেটেরিয়ার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শতভাগ টোকেন ব্যবস্থা, মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সেবার মান উন্নয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে ভর্তুকির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা বিনামূল্যে খাবার চান না। নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত খাবার চান। পাশাপাশি মূল্যতালিকা দৃশ্যমান রাখা, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, খাবারের পরিমাণ ঠিক রাখা এবং বসার ব্যবস্থা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনবিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান ও মূল্য পর্যবেক্ষণে একটি মনিটরিং কমিটি কাজ করছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ড. কেএএম রিফাত হাসান বলেন, ক্যাফেটেরিয়ার মান ও সেবার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ খাবার নিশ্চিতের চেষ্টা করছে।