বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে চট্টগ্রামে দায়ের হওয়া মামলাগুলো থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনসহ এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ। পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩A ধারায় এসব সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)।তবে মামলাগুলো থেকে আসামি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, অব্যাহতির আবেদনের ক্ষেত্রে সবার আবেদন একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। কোনো কোনো আবেদন দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হলেও অন্যগুলো দীর্ঘদিন পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কোনো কোনো আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে এগোচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩A ধারায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ কমিশনার বা তদন্ত তদারককারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন চাইতে পারেন। এতে কোনো আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে তাকে তদন্ত চলাকালে অব্যাহতির জন্য আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া যায়। আদালত সন্তুষ্ট হলে তাকে অব্যাহতি দিতে পারেন। তবে পরবর্তী তদন্তে পর্যাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া গেলে ওই ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত পুলিশ প্রতিবেদনে আবার অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।আলোচনায় জাহেদুল হকঅব্যাহতির সুপারিশের তালিকায় রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির উপদেষ্টা ও বোয়ালখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহেদুল হক। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে বাকলিয়া ও খুলশী থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়।তবে এসব মামলায় তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ।বোয়ালখালীর বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এনামুল হকের নামও রয়েছে এ তালিকায়। বাকলিয়া থানায় দায়ের করা একটি মামলা থেকে তাকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।জাহেদুল হককে অব্যাহতির সুপারিশের বিষয়ে সিএমপির ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রইছ উদ্দিন বলেন, কোনো ব্যক্তি মামলায় আসামি হলে তার অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে চার্জশিট দেওয়া হয়। আর সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।তিনি বলেন, জাহেদুল হকের বিষয়ে তদন্তে মামলার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় তার ব্যক্তিগত কোনো সম্পৃক্ততা নেই।প্রায় ৫০ জন বাদসিএমপির ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার রইছ উদ্দিন জানান, এখন পর্যন্ত সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় প্রায় ৫০ জনকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং কোন কোন মামলায় তাদের নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।সিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার হাসান ইকবাল চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট তথ্য ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনারের কাছে রয়েছে।শত শত আবেদনে বাছাই নিয়ে প্রশ্নসিএমপি সূত্রের দাবি, ১৭৩A ধারায় অব্যাহতির জন্য শত শত আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের সবগুলো একই গতিতে নিষ্পত্তি হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো আবেদন দীর্ঘদিন ডিসি ক্রাইমের দপ্তরে পড়ে থাকলেও কিছু আবেদন দ্রুত সংশ্লিষ্ট জোন ও থানায় পাঠিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হচ্ছে।পুলিশ কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, কিছু আবেদন আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগটির পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।অব্যাহতি প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা এবং আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তের ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ মামলা থেকে বাদ পড়ে থাকলে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।