শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়; নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কর্মমুখী শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হতে পারে।সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেন প্রধানমন্ত্রী।সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০, মাধ্যমিকে ২০, কলেজে ২৫, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন রয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত সাতজন শিক্ষককেও সম্মাননা দেওয়া হয়।শিক্ষককে হতে হবে শিক্ষার্থীর আদর্শপ্রধানমন্ত্রী বলেন, পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পেরোনোর পর শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই আদর্শ রোল মডেল। শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হবে।তিনি বলেন, সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পরিবারের পর শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।আধুনিকায়ন হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাপ্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সময়ে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এজন্য শিখন ও শিক্ষণ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।তিনি জানান, বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। চলতি বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই পাবে।মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে। কৌতূহল তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে এবার প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন বই দেওয়া হচ্ছে। আনন্দের সঙ্গে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ বই দেওয়া হবে।প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ককৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বাড়ালেও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রযুক্তিকে শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষকের শক্তি হিসেবে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।এর মাধ্যমে শিক্ষকরা ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারশিক্ষা খাতকে সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।কোনো শিশু যাতে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়লেও যাতে বেকার থাকতে না হয়, সে ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তিন লাখের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। এ পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশ বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য দূর করে সব অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।শিক্ষা সংস্কারে সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে—সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা ও বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।শিক্ষকতার মর্যাদা বাড়ানোর উদ্যোগশিক্ষকতা পেশাকে মেধাবীদের প্রথম পছন্দে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকতা কোনো ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা সাধারণ চাকরি হতে পারে না। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে চলতি বছর থেকেই নীতিমালার ভিত্তিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশ দেন তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মরত কিংবা অবসর—যেভাবেই থাকুন, মহান পেশার কারণে একজন শিক্ষক আমৃত্যু রাষ্ট্রের কাছে সম্মাননীয়। শিক্ষকরা যাতে বেতন বা অবসরভাতার জন্য অফিসে ঘুরে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য যথাসময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য অর্থ পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।