রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়ায় চীন, জাপান, আসিয়ান ও জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এ জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের অন্তরা হলে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতার আশ্বাসস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।তিনি জানান, সম্প্রতি জাপান সরকারের মিয়ানমারবিষয়ক জাতীয় পুনর্মিলনপ্রক্রিয়ার বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়া বাংলাদেশ সফর করেছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও তিনি নিজে তাঁর সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। জাপান সরকার এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।মন্ত্রী আরও জানান, চলতি মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কথা রয়েছে। ওই সফরেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।রাখাইনের বাস্তবতায় বহুমুখী কূটনীতিরাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে মিয়ানমারের আনুষ্ঠানিক সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির (এএ) উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ বাস্তবতায় প্রত্যাবাসনের পথ খুঁজতে বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। এ জন্য কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন পথ খোলা রাখা হবে।সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় কৌশলের তাগিদসেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক সমস্যা বা দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।তিনি বলেন, মিয়ানমারের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংকট ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কৌশলগত কূটনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। অস্থায়ী ত্রাণ সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে খণ্ডিত উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।জাতিসংঘে প্রত্যাবাসন ইস্যু জোরালোভাবে তোলার আশাসেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ বের করা সম্ভব হবে।তিনটি প্রবন্ধে প্রত্যাবাসনের কৌশলএফএসডিএসের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তিনটি বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।প্রথম প্রবন্ধে মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরেন অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ। দ্বিতীয় প্রবন্ধে রাখাইনের উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক শাহাব এনাম খান। তৃতীয় প্রবন্ধে আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত করণীয় তুলে ধরেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাফায়াত আহমদ।আলোচনায় বক্তারা বলেন, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। তাঁদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের অধিকার, বাসস্থান, জীবিকা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে। এসব অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা গেলে প্রত্যাবাসন দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।সেমিনারে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।