পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শক্তিশালী ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করে গভর্নর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার। প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিতের এ সিদ্ধান্তের পর মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি ও পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতা জুনায়েদ আকবরকে আটকের খবর পাওয়া গেছে। এতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ইমরান খানের দলের রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।পাকিস্তান সরকারের দাবি, প্রদেশটিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকারের ব্যর্থতার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পিটিআইয়ের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির যুক্তিপ্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস খাইবার পাখতুনখাওয়ায় অক্টোবরের শুরু থেকে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এবং আফগানিস্তান সীমান্তে সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছে। প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় হাজারো মানুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ার অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে প্রাদেশিক সরকারের কথিত উদাসীনতা নিয়ে মন্ত্রিসভা বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে।আফগান তালেবানের আদর্শিক মিত্র তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের তৎপরতা দেশটির নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব গোষ্ঠীর হামলায় হাজারো নিরাপত্তাকর্মী ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (সিআরএসএস) পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৮৫। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় তা ১৬ শতাংশ কম। বিপরীতে, পুরো পাকিস্তানে এ ধরনের মৃত্যু বেড়েছে ৯ শতাংশ।সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তপ্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি জরুরি অবস্থা অনুমোদন করেছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআই নেতাদের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।গভর্নর শাসন কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় সরকার নিযুক্ত গভর্নর প্রাদেশিক প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহায়তা এবং সরকারি সম্পত্তি ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রদেশটিতে সেনা মোতায়েন করা হবে।স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে এ পদক্ষেপকে নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।মুখ্যমন্ত্রীসহ পিটিআই নেতাদের আটকের খবরজরুরি অবস্থা ঘোষণার পরপরই পিটিআইয়ের প্রাদেশিক শাখার সভাপতি ও আইনপ্রণেতা জুনায়েদ আকবর এবং মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিকে আটকের খবর সামনে আসে। জুনায়েদ আকবরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি এক্স অ্যাকাউন্টে এ তথ্য জানানো হয়।৩৭ বছর বয়সী আফ্রিদি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এবং সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে প্রদেশজুড়ে লংমার্চের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পিটিআইয়ের দাবি, এসব অভিযানে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।প্রাদেশিক সরকার স্থগিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও আফ্রিদি বিক্ষোভকারীদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লংমার্চ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প নেই এবং আইন অনুযায়ী দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।পিটিআইয়ের শক্ত ঘাঁটিতে ক্ষমতার পালাবদলখাইবার পাখতুনখাওয়া ২০১৩ সাল থেকে পিটিআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘাঁটি। ২০২৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে দলটি পরিষদের ৬০ শতাংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারানোর পর থেকে ইমরান খান ও তাঁর দলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ইমরান-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সর্বাধিক আসন পেলেও পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণে তাঁরা সরকার গঠন করতে পারেননি।পিটিআইয়ের মুখপাত্র শেখ ওয়াকাস আকরাম অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি ও জুনায়েদ আকবরকে আটকের মধ্য দিয়ে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর দাবি, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা নয়; বরং পিটিআইকে দুর্বল করা এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে উপেক্ষা করা।অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই গভর্নর শাসন জারি করা হয়েছে।