সরকারি দুটি ল্যাবরেটরিতে হয় ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রয়োজন পুলিশি তদন্ত বা আদালতের নির্দেশবাংলাদেশে কোনো শিশুর জৈবিক বাবা-মায়ের পরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে চাইলেই সরাসরি সরকারি পরীক্ষাগারে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সাধারণত পুলিশি মামলা বা আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন হয়। বর্তমানে দেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় দুটি সরকারি পরীক্ষাগারে।সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিঠাই’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত শিশুকে ঘিরে পিতৃত্বের দাবি ও পাল্টা দাবির পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এক নারী শিশুটিকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করে ডিএনএ পরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে শিশুটির বর্তমান পরিবার সেই দাবি অস্বীকার করেছে। ফলে শিশুটির পরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষা কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।কোথায় করা হয় পরীক্ষামহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সুফিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার জন্য দুটি সরকারি পরীক্ষাগার রয়েছে। একটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি। অন্যটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি।আবু সুফিয়ান জানান, এসব পরীক্ষাগারে ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সরাসরি গিয়ে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের পরীক্ষা করানো যায় না। সাধারণত পুলিশি মামলা বা আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে এ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। তবে ইমিগ্রেশন এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো নির্দিষ্ট প্রয়োজনেও আত্মীয়তার সম্পর্ক যাচাইয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।আবেদন করবেন যেভাবেসিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আদালতের আদেশ ছাড়া সিআইডির পরীক্ষাগারে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না।তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের পরীক্ষা করাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে পারেন। প্রয়োজনে ঢাকার বিচারিক আদালতেও সরাসরি মামলা করার সুযোগ রয়েছে। এরপর আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।অর্থাৎ, শিশুর জৈবিক বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত দাবি বা সন্দেহের ভিত্তিতে সরকারি ফরেনসিক পরীক্ষাগারে গিয়ে পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই।ডিএনএ পরীক্ষা কীভাবে কাজ করেডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড জীবের বংশগত তথ্য বহন করে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে বংশগত বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত হয় ডিএনএর মাধ্যমে। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। সেই প্রোফাইল তুলনা করে জৈবিক সম্পর্ক নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যায়।ডিএনএ পরীক্ষা মূলত দুই ধরনের—ফরেনসিক ও ডায়াগনস্টিক। অপরাধ তদন্ত, অজ্ঞাতপরিচয় মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত এবং পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ফরেনসিক পরীক্ষা ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, জিনগত ত্রুটি ও নির্দিষ্ট বংশগত রোগ শনাক্তে ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করা হয়। এ ধরনের পরীক্ষা বিভিন্ন রোগনির্ণয় কেন্দ্রে করা সম্ভব।নিখোঁজ শিশুকে ঘিরে বিরোধপ্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘আমার সন্তান কোথায়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করে বেসরকারি সংস্থা জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। সেখানে কামরাঙ্গীর চরের একটি নিখোঁজ শিশুর পরিবার দাবি করে, ২০২৪ সালে বাসার সামনে খেলতে গিয়ে শিশুটি হারিয়ে যায়। পরে ‘মিঠাই’ নামের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে শিশুটিকে দেখা গেছে বলে অভিযোগ করে পরিবারটি।পরিবারটির অভিযোগ, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরও তারা সন্তানের সন্ধান পায়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি নিয়ে করা মামলা প্রথমে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) যায়।অন্যদিকে, ‘মিঠাই’ পেজে শিশুটির বর্তমান মা পরিচয়ে একজন নারী ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেন, ওই নারী প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁদের পরিবারকে হয়রানি করছেন। তাঁর বক্তব্য, শিশুটির জন্ম ২০২১ সালের জুলাইয়ে—কামরাঙ্গীর চরের শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার অনেক আগেই। তিনি আরও দাবি করেন, শিশুটির বিভিন্ন বয়সের ছবি ও ভিডিও পেজটিতে রয়েছে।তবে শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করা নারীর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে দুই পক্ষের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।কামরাঙ্গীর চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, তাঁর থানায় ওই নামে কোনো নিখোঁজ শিশুর তথ্য বা জিডি পাওয়া যায়নি বলে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তাঁদের থানায় জিডি বা মামলা হয়েছে কি না, তা নথি দেখে নিশ্চিত হতে হবে।আইনগত প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। তবে সরকারি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। পুলিশি তদন্ত বা আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগার পরীক্ষা সম্পন্ন করে।